১৯০৫-এর বঙ্গভঙ্গ ও বাঙালি জাতীয়তাবাদের উত্থান

. ভূমিকা: বঙ্গভঙ্গের ঘটনাকে নতুন দৃষ্টিতে দেখা

১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ শুধুমাত্র একটি প্রশাসনিক বিভাজন ছিল না; এটি ছিল উপনিবেশিক শাসনের কৌশলগত প্রয়োগ, যা বাংলা ও ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী অধ্যায় তৈরি করে। বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে তীব্র জনবিক্ষোভ, বয়কট আন্দোলন, স্বদেশি রাজনীতি ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের পুনরুজ্জীবন, বাঙালি জাতীয়তাবাদের সর্বপ্রথম সংগঠিত রূপ এবং জাতিসত্তার চেতনা—সবকিছু একত্রে এই ঘটনার মাধ্যমে সংহত হয়। ফলে বঙ্গভঙ্গ ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়—যেখানে রাজনৈতিক অধিকারচেতনা, সামাজিক প্রয়োজন, সাংস্কৃতিক পরিচয় ও অর্থনৈতিক প্রতিরোধের এক মহাযুগ্ম রূপ দেখা যায়।


২. বঙ্গভঙ্গের পটভূমি: কীভাবে এবং কেন এই সিদ্ধান্ত?

২.১ লর্ড কার্জনের নীতি ও ঔপনিবেশিক উদ্দেশ্য

লর্ড কার্জন ব্রিটিশ ভারতের ভাইসরয় হিসেবে প্রশাসনে দক্ষতা ও “Divide and Rule” নীতি—দুটোকেই প্রাধান্য দেন। বঙ্গভঙ্গের মূল যুক্তি ছিল: বাংলা প্রশাসনিকভাবে বিশাল, জনগোষ্ঠীর চাপ অত্যধিক, কার্যকারিতা হ্রাস পাচ্ছে। কিন্তু ইতিহাস-গবেষণা দেখায়—এটি ছিল রাজনৈতিকভাবে মুসলমান ও হিন্দুকে আলাদা করে উভয় সম্প্রদায়ের ঐক্য ভাঙা এবং জাতীয় চেতনাকে দুর্বল করা।

২.২ বাংলা বিভাজন: নতুন ভূগোল, নতুন রাজনীতি

বিভাজনের পর:

  • পূর্ববঙ্গ ও অসম—ঢাকা রাজধানী, মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল
  • পশ্চিমবঙ্গ—কলকাতা রাজধানী, হিন্দু মধ্যবিত্তের বাণিজ্য ও প্রশাসনিক শক্তির কেন্দ্র

এই বিভাজন বাংলা-সংহতির বিপরীত; একই ভাষা, সংস্কৃতি ও ইতিহাসের জনগণকে শাসনের স্বার্থে আলাদা করা হয়।


৩. বঙ্গভঙ্গের প্রকৃত উদ্দেশ্য বিশ্লেষণ

১. রাজনৈতিক চেতনার উত্থান দমন:
বাঙালি শিক্ষিত মধ্যবিত্ত তথা নবজাগরণচেতা মানুষ ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় হচ্ছিল। এই অঞ্চলকে বিভক্ত করলে প্রতিরোধ ভেঙে যাবে—এটাই ছিল ব্রিটিশদের ধারণা।

  1. ধর্মভিত্তিক বিভাজন:
    হিন্দু-মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভক্তি বাড়িয়ে রাজনৈতিক ঐক্যকে দুর্বল করা।
  2. অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ:
    কলকাতার ব্যবসায়ী সম্প্রদায়কে সীমিত প্রভাবের মধ্যে রাখা এবং ঢাকায় নতুন প্রশাসনিক কেন্দ্র গড়ে তুলে করব্যবস্থাকে পুনর্গঠিত করা।

৪. বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী প্রতিক্রিয়া: বাঙালি সমাজের জাগরণ

৪.১ তীব্র প্রতিবাদ: প্রথম সংগঠিত সর্বদেশীয় বিরোধ আন্দোলন

১৯০৫ সালের ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে কলকাতা, রাজশাহী, যশোর, ঢাকা, চট্টগ্রাম—সব জায়গাতেই গড়ে ওঠে সভা, সমাবেশ, পিকেটিং, মিছিল। শিক্ষিত বাঙালিরা, ছাত্রসমাজ, ব্যবসায়ী, কৃষক—সবাই আন্দোলনে শরিক হয়।

৪.২ রবীন্দ্রনাথের ভূমিকা: রক্ষাবন্ধন ও সাংস্কৃতিক ঐক্য

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী আন্দোলনকে কেবল রাজনৈতিক নয়, সাংস্কৃতিক ঐক্যের কার্যক্রমে উন্নীত করেন।

  • রক্ষাবন্ধন উৎসব—হিন্দু-মুসলমান একে অপরের হাতে রাখি বাঁধে।
  • দেশাত্মবোধক গান—”বাঙ্মা, তোমায় ভোলাবার…” ইত্যাদি।
  • শিল্প-সাহিত্য, নাটক, প্রবন্ধ—সবই আন্দোলনকে নৈতিক শক্তি প্রদান করে।

৪.৩ ছাত্রসমাজ: প্রথম বড় রাজনৈতিক ভূমিকা

ছাত্ররা পিকেটিং করে বিদেশি পণ্য দোকানে ধর্না দেয়, মিছিল করে, বয়কট কার্যক্রম পরিচালনা করে এবং স্বদেশি শিল্প প্রতিষ্ঠায় নেতৃত্ব দেয়।


৫. স্বদেশি আন্দোলন: বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী আন্দোলনের কেন্দ্রীয় রূপ

স্বদেশি আন্দোলন শুধু রাজনৈতিক ছিল না; এটি ছিল একটি পূর্ণাঙ্গ সামাজিক-অর্থনৈতিক আন্দোলন।

৫.১ বিদেশি পণ্য বর্জন

মানুষ বিদেশি কাপড় পুড়িয়ে স্বদেশি কাপড় ব্যবহার করে। এর ফলে ইংরেজ ব্যবসায়ীরা বিপুল ক্ষতির সম্মুখীন হয়।

৫.২ ঘরোয়া শিল্পের পুনরুজ্জীবন

বাংলায় তাঁত, কুটির শিল্প, রাসায়নিক শিল্প, লবণ, কাগজ, দেশলাই—সব সৃষ্টি হতে থাকে। নারীসমাজ এখানে বড় ভূমিকা পালন করে—ঘরে ঘরে চরকা চলে।

৫.৩ রাজনৈতিক সংগঠনের উত্থান

  • বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেস
  • যুগান্তর দল
  • অনুশীলন সমিতি (বিপ্লবী কার্যক্রমের জন্মস্থান)

এই সংগঠনগুলো বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে পরবর্তীকালে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।


৬. ধর্মীয় বিভাজন নাকি যৌথ সংগ্রাম?—মতবাদের সংঘাত

যদিও ব্রিটিশরা বঙ্গভঙ্গের মাধ্যমে ধর্মীয় বিভাজন বাড়াতে চেয়েছিল, বাস্তবে দুই সম্প্রদায়ের বহু মানুষ একত্রে প্রতিরোধে দাঁড়ায়।

  • ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি ওঠে
  • পূর্ববঙ্গে মুসলিম সমাজের মধ্যে শিক্ষাচেতনার উত্থান
  • মুসলিম বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে আন্দোলন-সমর্থন (যেমন খলিফাত আন্দোলনের পূর্বধারা)

তবে তাত্ত্বিকভাবে দেখা যায়—পূর্ববঙ্গের মুসলমান সমাজের একটি অংশ প্রথমদিকে বঙ্গভঙ্গ সমর্থন করলেও পরবর্তীতে বাঙালি জাতীয়তাবাদে তাদের বিশাল অংশগ্রহণ ঘটে।


৭. বঙ্গভঙ্গ প্রত্যাহার—কারণ ও ফলাফল

১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ প্রত্যাহার করা হয়।
প্রধান কারণ:
১. বাঙালির ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ
২. ইংরেজ ব্যবসায়ীদের অর্থনৈতিক ক্ষতি
৩. আন্তর্জাতিক সমালোচনা
৪. আন্দোলনের শক্তি দিন দিন বেড়ে যাওয়া

ফলাফল:

  • বাংলা পুনরায় একীভূত হয়
  • বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তি আরও শক্ত হয়
  • রাজনৈতিক সংগঠনের প্রসার বৃদ্ধি পায়
  • বিপ্লবী আন্দোলনের জন্মমাত্রা ত্বরান্বিত হয়

৮. বঙ্গভঙ্গ ও ভারতীয় জাতীয়তাবাদের সম্পর্ক

১৯০৫–১৯১১ সময়কাল ভারতের জাতীয় আন্দোলনে নতুন অধ্যায় সৃষ্টি করে। বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী আন্দোলন ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম ভিত্তি হয়ে ওঠে।

  • কংগ্রেস দল বিভাজিত হয়ে চরমপন্থী ও উদারপন্থী শিবির গঠন করে
  • জাতীয় অর্থনৈতিক চিন্তার জন্ম
  • স্বশাসন ধারণা প্রসারিত হয়

৯. সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রভাব: বাংলা সমাজের জাগরণ

  • নারীর ভূমিকা বৃদ্ধি: স্বদেশি আন্দোলনে নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ বাংলা নারীমুক্তি আন্দোলনের ভিত্তি স্থাপন করে।
  • শিক্ষার প্রসার: জাতীয় শিক্ষাকেন্দ্র গড়ে ওঠে—ন্যাশনাল কাউন্সিল অফ এডুকেশন প্রতিষ্ঠা।
  • সাহিত্য-শিল্পে দেশপ্রেম: বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, দ্বিজেন্দ্রলাল—সকলেই স্বদেশি ভাবধারার সাহিত্য উন্মোচন করেন।

বঙ্গভঙ্গ—ভাগ নয়, ঐক্যের জন্ম

১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ বাঙালি জাতীয়তাবাদকে সংগঠিত করে, রাজনৈতিক চেতনার জন্ম দেয়, অর্থনৈতিক স্বাধীনতার ধারণা সৃষ্টি করে এবং জনতার মধ্যে আত্মপরিচয়ের সূচনা ঘটায়। বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী আন্দোলন ছিল ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রথম জনমুখী আন্দোলন—যেখানে অর্থনীতি, রাজনীতি, সংস্কৃতি, ভাষা, শিক্ষা এবং জাতিগত চেতনা সমন্বিতভাবে উঠে আসে।

বঙ্গভঙ্গ ইতিহাসের পাঠ দেয়—জাতীয় ঐক্য ভাঙার চেষ্টা যতই হোক, জনগণের শ্রেণি-সচেতনতা ও সাংস্কৃতিক বন্ধন জাতির শক্তিকে পুনঃউজ্জীবিত করতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *