ইংরেজ শাসনামলে বাংলার কৃষি, বাণিজ্য ও শিল্প

ইংরেজ শাসনামলে বাংলার কৃষি, বাণিজ্য ও শিল্প

ইংরেজ শাসনমালার অধীনে (প্রধানত ১৭৬৫-১৯৪৭) বাংলার কৃষি, বাণিজ্য ও শিল্পে মৌলিক পরিবর্তন ঘটে — যে পরিবর্তনগুলোর মূলে ছিল উপনিবেশগত অর্থনীতি গঠন, বাণিজ্যিক অনুকূলতার জন্য নীতির পুনর্বিন্যাস এবং গৃহীত রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত। এই নিবন্ধে নির্দিষ্টভাবে বিশ্লেষণ করা হবে—(ক) জমিদারি ও কিষাণ সম্পর্কিত নীতি ও তাদের ফল (খ) বাণিজ্য কাঠামোর রূপান্তর ও বন্দর-বাণিজ্যের ভূমিকা (গ) হস্তশিল্প ও স্থানীয় শিল্পের পতন ও পুনর্গঠনের সূত্র এবং (ঘ) এসব নীতির সামাজিক-অর্থনৈতিক প্রভাব ও প্রতিরোধ।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও প্রশাসনিক নীতি

ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিজয় ও ১৭৬৫ সালের দিওয়ানি অধিকার লাভ বাংলার ক্ষেত্রের রাজস্ব সংগ্রহকে কোম্পানির সরাসরি আর্থিক অভিলাষের নিমিত্তে পরিণত করে। ১৭৯৩ সালে লর্ড কর্নওয়ালিস কর্তৃক সংযুক্ত Permanent Settlement (পার্মানেন্ট সেটেলমেন্ট) বাংলা-বিহার-উপজেলায় জমিদারী ব্যবস্থাকে স্থায়ী করে। এই নীতির লক্ষ্য ছিল রাজস্ব সংগৃহীতকে স্থির করে বৃত্তিচালিত প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা — কিন্তু ফলপ্রসূতা ছিল পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াশীল: জমিদারদের ওপর শক্ত প্রেরণা তৈরি হলো কর-সংগ্রহে—যা কৃষকের ওপর চূড়ান্ত বোঝা সৃষ্টি করল এবং দীর্ঘমেয়াদে কৃষিক্ষেত্রে বিনিয়োগ এবং উৎপাদনশীলতার অধঃপতন ঘটল।

কৃষি: খণ্ডিত পরিবর্তন ও শক্ত-সংকোচন

  1. জমিদারি ও কৃষকত্বের আর্থিক চাপ: পার্মানেন্ট সেটেলমেন্টে করস্থিরতা থাকলেও অতিরিক্ত ধার্য ও জরিমানা, মধ্যস্থতাকারী ধৃত্য (মধ্যস্থ) এবং জমিদারদের চাহিদা-বর্ধন কৃষককে ক্ষতিগ্রস্ত করে। কৃষকরা ঋণের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে পড়েন; ফলে জমি বিক্রি ও উদ্বাস্তুতা দেখা দেয়।
  2. বাণিজ্যিক কৃষিতে রূপান্তর: কোম্পানি-কালের চাহিদা অনুযায়ী নীল, চিনি, তামাক, চালা (cash crops) বাণিজ্যিকভাবে উত্পাদন বাড়ে। নীলচাষ (indigo) উদাহরণ: গ্রামীণ কিষাণদের উপর জোর করে চাষ করানো এবং অল্প মূল্য চুক্তি তাদের আর্থিক দুরবস্থার কারণ হয়ে ওঠে; ১৮৫৯–৬০ সালের পরে নীল বিস্মৃতি ও বিক্ষোভ (নীল বিদ্রোহ) দেখা দেয়।
  3. প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও অর্থনৈতিক স্ফুলিঙ্গ: ১৯শ শতকের উদাহরণে দুর্ভিক্ষ (যেমন ১৮৯९–১৯০০ ও ১৯৪৩) কৃষি উৎপাদন ও বাজারে ভাঙন সৃষ্টি করে; উপনিবেশিক নীতির কারণে ত্রাণ ব্যবস্থার ব্যর্থতা হতাশাজনক মাত্রায় হতাশা ও মৃত্যু বাড়ায়।
  4. প্রয়োজনে প্রযুক্তিগত পরিবর্তন কিন্তু সীমিত বিস্তার: কিছু অঞ্চলে নতুন জলের মার্গ, পাম্প, বীজগত উন্নয়ন দেখা গেলেও তা ব্যাপক কায়েমি সাফল্য আর আনতে পারেনি—কারণ ভূমি মালিকানার সংকট, ঋণ এবং বাজারদাসত্ব এটির বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

বাণিজ্য: স্থানীয় থেকে বিশ্ববাজারে সংযোগ

  1. বন্দর ও ট্রান্সপোর্ট নীতি: কলকাতা, চট্টগ্রাম, বন্দরগঞ্জ—বন্দরিকরণ ও নৌপথে চাহিদা বৃদ্ধি পায়। ব্রিটিশ বাণিজ্যনীতি স্থানীয় কুটির শিল্প ও স্থানীয় বাজারকে গ্লোবাল সার্ভিসে রূপান্তর করে — কিন্তু ধারায় একদিকে পণ্য রপ্তানি বাড়লেও স্থানীয় চাহিদা ও মানে ক্ষতি ঘটে।
  2. রপ্তানি পণ্য ও একনিষ্ঠ চাষ: জুট, নীল, কডা (indigo), চিনি, তামাক ইত্যাদি রপ্তানিতে অগ্রণী হয়; জুট-শিল্প বিশেষত পূর্ববঙ্গকে বিশ্বের কাপড় ও বাঁশজাত সাপ্লাই-চেইনে যুক্ত করে।
  3. বাণিজ্যিক একীকরণ ও মূল্য-ভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ: কোম্পানি ও পরবর্তীতে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান স্থানীয় শিল্প ও কৃষিকে নির্দিষ্ট মূল্য দিয়ে ক্রয় করত; ফলে মধ্যস্বত্বভোগীর শক্তি ও কৃষকের দরিদ্রতার চক্র গঠন করল।
  4. অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যে প্রভাব: স্থানীয় হস্তশিল্প ও গ্রামীণ বাজার সংকুচিত হলে কৃষিজাত পণ্যের বাজারে অসমতা বেড়ে যায়—কৃষককে ন্যূনতম মূল্যেই বিক্রি করতে বাধ্য করা হয়।

শিল্প: কুটির থেকে মনোকাপিটালিস্ট উৎপাদনে শরিকতার শোক

  1. হস্তশিল্পের ধ্বংস (De-industrialization): আগে বাংলার হস্তচালিত বস্ত্রশিল্প (হস্তচালিত কাতন, জামদানি, নকশিকাঁথা) বিশ্ববাজারে উচ্চমানের হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু ইউরোপীয় উৎপাদন ও ভূলাভাবী ট্যারিফ নীতির ফলে সস্তা মিল-উৎপাদিত তাঁতজাত বাংলা বাজারে ঢুকে পড়ে; ফলে গ্রামের তাঁতকার ও কুটির শিল্পী ধীরে ধীরে বেকার ও দারিদ্র্যর দিকে ঠেলে দেওয়া হয়।
  2. ঝুঁকিপূর্ণ শিল্পায়ন ও ম্যানুফ্যাকচারিং এর অস্থিতিশীল বৃদ্ধি: রেলপথের প্রসার ব্যবসা-সংযোগ বাড়ালেও মূলত কাঁচামাল রপ্তানির সুবিধা দিল; স্থানীয় মানসম্মত পৌঁছানো মানের শিল্প প্রতিষ্ঠায় সীমিত উৎসাহ ছিল। বড় মাপের মিলগুলি নগর কেন্দ্রে সীমাবদ্ধ থেকে যায় এবং গ্রামীণ শিল্পের পুনরুজ্জীবন ঘটেনি।
  3. রেল ও যোগাযোগ ব্যবস্থার দ্বিধা ও সুবিধা: রেলের আগমন পণ্য পরিবহন সস্তা করলেও একই সঙ্গে কাঁচামাল রপ্তানি ও কৃত্রিম বাজারের নেটওয়ার্ককে ত্বরান্বিত করে, যা ঔপনিবেশিক রপ্তানি-কেন্দ্রিক অর্থনীতিকে শক্ত করল।

সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব

  1. আয়ের অসমতা ও সামাজিক বৈষম্য: জমিদার, মধ্যস্বত্বভোগী ও ব্যবসায়ী শ্রেণীর ধনীকরণ এবং কৃষক ও কুটিরশিল্পীর দরিদ্রকরণ সশরীরে উপনিবেশী শ্রেণী বিভাজন ঘটায়।
  2. নগরায়ণ ও পেশাগত পরিবর্তন: শহরে শ্রমশক্তি প্রবাহ বাড়ে, নতুন পেশা তৈরী হলেও শহরগঠন ছিল অনিয়মিত এবং শ্রমিকদের শোষণ ছিল সাধারণ।
  3. সামাজিক প্রতিরোধ ও রাজনৈতিক চেতনায় রূপান্তর: কৃষি ও শিল্পের সংকট সময়ে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে ওঠে — উদাহরণ: নীল বিদ্রোহ (১৮৫৯–৬০), বিভিন্ন কৃষক আন্দোলন ও পরে স্বদেশি আন্দোলন। এ প্রতিরোধ রাজনীতিক চেতনাকে জাগ্রত করে এবং জাতীয়তাবাদের ভিত্তি তৈরিতে সহায়ক হয়।

প্রতিরোধ, আন্দোলন ও নীতিগত প্রতিক্রিয়া

  1. কৃষক ও হস্তশিল্পীদের প্রতিবাদ: নীলবিদ্রোহ, শ্রমিক আর কৃষক ধর্মঘট এবং বয়কট মুভমেন্ট—এগুলো উপনিবেশবিরোধী চেতনায় ভাঙন আনে।
  2. স্বদেশি আন্দোলন ও স্থানীয় শিল্পপুনঃস্থাপন: ১৯ বছরাব্দের শেষভাগে বৃটিশ পণ্যের বয়কট এবং স্থানীয় উদ্যোগে জাগরণ দেখা যায়; ১৯০৫-এর বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনও অর্থনৈতিক বোধকে রাজনৈতিক রূপ দেয়।
  3. শিক্ষা ও বুদ্ধিজীবী ভূমিকা: শিক্ষিত বাঙ্গালী নয়া-নীতির বিরুদ্ধে লিখিত প্রতিরোধ, সাংবাদিকতা ও সংগঠনের মাধ্যমে সামাজিক সচেতনতা তৈরি করতে সাহায্য করে।

ইংরেজ শাসনামের নীতিগুলি (পার্মানেন্ট সেটেলমেন্ট, বাণিজ্যকেন্দ্রিক করনীতি, রেল-নেটওয়ার্ক ও বোর্ড-ট্যারিফ নীতি) বাংলার কৃষি, বাণিজ্য ও শিল্পে দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলেছে: কৃষক ও হস্তশিল্পীর দারিদ্র্যায়ন, রপ্তানি-কেন্দ্রিক অর্থনীতির দৃঢ়ীকরণ এবং নগর-গ্রাম ভেদকে তীব্র করা। একদিকে অর্থনৈতিক আধুনিকীকরণ partial ভাবে ঘটলেও অন্যদিকে তা সামাজিক অসাম্য ও সাংস্কৃতিক ক্ষয়কে ত্বরান্বিত করে। এটি পরবর্তীতে রাজনৈতিক বিরূপ প্রতিক্রিয়া—জাতীয়তাবাদ ও স্বাধীনতা আন্দোলনের জন্মে সহায়ক ভূমিকা রাখে।

গবেষণার জন্য পরবর্তী প্রশ্নসমূহ:

  • পার্মানেন্ট সেটেলমেন্টের আলাদা আলাদা অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব তুলনামূলকভাবে কী ছিল?
  • উপনিবেশিক করনীতি ও স্থানীয় কৃষি-প্রযুক্তির মধ্যে সম্পর্ককে পরিসংখ্যানভিত্তিক কেমনভাবে মডেল করা যায়?
  • হস্তশিল্পের ধ্বংস ও স্থানীয় পুনর্জাগরণের ঐতিহাসিক কেস-স্টাডি কীভাবে অনুধাবন করা যায়?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *