প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় ইতিহাস : বাংলার জনপদ, সংস্কৃতি, শাসনব্যবস্থা ও স্থাপত্য


প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় ইতিহাস : বাংলার জনপদ, সংস্কৃতি, শাসনব্যবস্থা ও স্থাপত্য

বাংলার ইতিহাস সুপ্রাচীন, সুদীর্ঘ এবং বহুমাত্রিক। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর এই নদীমাতৃক ভূখণ্ড দক্ষিণ এশিয়ার সভ্যতাগুলোর মধ্যে অন্যতম পুরোনো বসতি অঞ্চল হিসেবে বিবেচিত। প্রাচীন যুগের জনপদ, তৎকালীন রাজনৈতিক কাঠামো, ধর্মীয় বিবর্তন, সাংস্কৃতিক পরম্পরা এবং মধ্যযুগে মুসলিম সুলতানি ও মুঘল শাসন—সব মিলিয়ে বাংলার ইতিহাস আজও বিশ্ব সভ্যতার মূল্যবান অধ্যায়। এই প্রবন্ধে প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় বাংলার জনপদ, রাজনীতি, সমাজ-সংস্কৃতি, ধর্মীয় স্থাপত্য এবং প্রশাসনিক কাঠামোর একটি বিশদ ধারাবাহিক চিত্র উপস্থাপন করা হলো।


১. প্রাচীন বাংলার জনপদ ও সভ্যতার পরিচয়

বাংলা বা বঙ্গ অঞ্চল বহু প্রাচীনকাল থেকেই মানুষের বসতির উপযুক্ত ছিল। গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র, যমুনা, পদ্মা ও মেঘনার মিলিত সোপানে গড়ে ওঠে উর্বর সমতলভূমি। এ অঞ্চলে প্রাচীন জনপদ গড়ে ওঠে মূলত নদীর তীরে—যেখানে জন্ম নেয় কৃষি, বাণিজ্য ও প্রাথমিক সভ্যতার বিভিন্ন নিদর্শন।

১.১ প্রাচীন জনপদসমূহ

বাংলার জনপদগুলো সাধারণত পাঁচটি উল্লেখযোগ্য অঞ্চলে বিভক্ত ছিল—

  • পুন্ড্রবর্ধন
    বর্তমান বগুড়া ও রংপুর অঞ্চল। এটি ছিল বাংলার অন্যতম শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ জনপদ। মহাস্থানগড় ছিল এই জনপদের রাজধানী।
  • সমতট
    বর্তমান কুমিল্লা–নোয়াখালী অঞ্চল। সমতট ছিল বাণিজ্যের অন্যতম কেন্দ্র।
  • বঙ্গ
    বর্তমান খুলনা–বরিশাল অঞ্চল। এখান থেকেই ‘বঙ্গ’ নামটি প্রসার লাভ করে।
  • রাড়
    বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিমাঞ্চল।
  • বরেন্দ্র
    উত্তরবঙ্গের সমৃদ্ধ কৃষিনির্ভর জনপদ।

১.২ অর্থনীতি ও সমাজ

প্রাচীন বাংলার অর্থনীতি ছিল কৃষিনির্ভর। ধান, আখ, তিল, শক্তিশালী মৎস্যসম্পদ ইত্যাদি কৃষিজ উৎপাদনে অঞ্চলটি বিখ্যাত ছিল। জনপদগুলোর সমাজ কাঠামো ছিল গোষ্ঠীনির্ভর। ধীরে ধীরে গোষ্ঠীগুলো রাজনৈতিক সমাজে রূপ নেয়—যা মহাস্থানগড় বা চন্দ্রকেতুগড়ের মতো প্রত্নস্থল থেকে স্পষ্ট।


২. পাল ও সেন যুগের বাংলার শিক্ষা, সংস্কৃতি ও ধর্ম

বাংলার প্রাচীন ইতিহাসে পাল ও সেন যুগ (৮ম—১২শ শতক) ছিল সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক উন্নতির স্বর্ণযুগ।

২.১ পাল সাম্রাজ্য: বৌদ্ধ ধর্মের উন্নয়ন

পাল শাসকরা সাধারণত মহাযান ও বজ্রযান বৌদ্ধ অনুসারী ছিলেন। ধর্মপাল, দেবপাল, মহানিপাল প্রমুখ রাজারা বৌদ্ধ ধর্ম ও শিক্ষার প্রসারে অসামান্য অবদান রাখেন।

পাল যুগে গড়ে ওঠে—

  • নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়
  • বিক্রমশীলা বিশ্ববিদ্যালয়
  • সোমপুর মহাবিহার (পাহাড়পুর)
    এটি বর্তমানে UNESCO বিশ্ব ঐতিহ্য।

২.২ পাল যুগের শিল্প-সংস্কৃতি

  • টেরাকোটা শিল্প
  • পাথরের মূর্তি
  • মৃৎশিল্প
  • ব্রোঞ্জের মূর্তি

এই যুগে প্রচুর বৌদ্ধ শিলালিপি, মূর্তি ও ভাস্কর্য তৈরি হয়, যা আজও বিশ্বে পরিচিত।

২.৩ সেন যুগ

সেনদের আগমনে বাংলায় ব্রাহ্মণ্যবাদ জোরদার হয়। রাজা বল্লাল সেন, লক্ষ্মণ সেন বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও হিন্দু ধর্মের প্রতি বিশেষ অনুরাগী ছিলেন। তাঁরাই ‘কুলীন প্রথা’-র সূচনা করেন।

সেন যুগে উৎপন্ন হয়—

  • সংস্কৃত সাহিত্য
  • হিন্দু মন্দির স্থাপত্য
  • সমাজে পুনঃবর্ণায়ন ব্যবস্থা

৩. বৌদ্ধ ও হিন্দু ধর্মীয় স্থাপত্যের ইতিহাস

বাংলার স্থাপত্যের ইতিহাস শুরু হয় বৌদ্ধ বিহার, স্তূপ ও চৈত্য নির্মাণের মাধ্যমে। পাহাড়পুরের সোমপুর মহাবিহার এশিয়ার অন্যতম বৃহত্তম বৌদ্ধ স্থাপত্য। এর পাশাপাশি ময়নামতি, ভান্ডারকুম্ভ, শালবন বিহারের নিদর্শনও উল্লেখযোগ্য।

হিন্দু ধর্মীয় স্থাপত্য মূলত সেন যুগে বিস্তার লাভ করে। নবরত্ন মন্দির, টেরাকোটা অলংকরণ, পাথরের খোদাই—এসব মধ্যযুগীয় স্থাপত্য আজো ঐতিহ্যের অংশ।


৪. মুসলিম শাসনামলে বাংলার প্রশাসন ও সমাজ

১২শ শতকের শেষভাগে ইখতিয়ার উদ্দীন মুহাম্মদ বখতিয়ারের বঙ্গবিজয়ের মাধ্যমে মুসলিম শাসনের শুরু। এসময় বাংলায় নতুন প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে ওঠে।

৪.১ প্রশাসন

  • ইকতা ব্যবস্থা
  • রাজস্ব ব্যবস্থা
  • কোতোয়ালি ও শহর প্রশাসন

মুসলিম শাসকরা বাংলায় কৃষি উন্নয়ন, নদী খনন, সড়ক নির্মাণে বিশেষ ভূমিকা রাখেন।

৪.২ সমাজ ও সংস্কৃতি

মুসলিম শাসনে বাংলায়—

  • মসজিদ
  • খানকা
  • দরগাহ
  • মাদ্রাসা
  • পাথর ও ইটের মসজিদ

নির্মিত হয়। ফার্সি ও আরবি বাংলা ভাষার সাথে সংযোগ স্থাপন করে বাংলা ভাষাকে সমৃদ্ধ করে তুলেছিল।


৫. ইলিয়াস শাহ ও হোসেন শাহ যুগের স্বাধীন সুলতানি শাসন

বাংলায় স্বাধীন সুলতানি শাসনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শাসক ছিলেন ইলিয়াস শাহ (১৪ শতক)। তিনি পুরো বাংলা অঞ্চলকে একত্র করেন এবং প্রথম স্বাধীন সুলতানাত প্রতিষ্ঠা করেন। রাজধানী ছিল গৌড়।

৫.১ ইলিয়াস শাহিরা

  • বাংলার প্রশাসন উন্নয়ন
  • সড়ক, বন্দর, বাণিজ্য বিস্তার
  • কৃষি উন্নয়ন
  • মুদ্রা ব্যবস্থার উন্নতি

৫.২ হোসেন শাহ (১৬ শতক)

তাঁর আমল বাংলার—

  • সাহিত্য
  • কৃষি
  • বাণিজ্য
  • ধর্মীয় সহিষ্ণুতা
  • শিল্প

সবক্ষেত্রেই উন্নতি হয়। মঙ্গলকাব্যের বিস্তারও এই আমলে হয়—চণ্ডীমঙ্গল, মনসামঙ্গল ইত্যাদি।


প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় বাংলার ইতিহাস বহুরূপী। বৌদ্ধ, হিন্দু, মুসলিম—সব ধারাই বাংলার সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছে। স্থাপত্যে বহুমাত্রিকতা, সমাজে সহনশীলতা, ভাষায় বহুধর্মীতা—সবকিছুই মিলে বাংলা হয়ে উঠেছে একটি অনন্য সভ্যতা।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *