বিশ্বসাহিত্যে রিয়ালিজমের বিকাশ


বিশ্বসাহিত্যে রিয়ালিজমের বিকাশ

ভূমিকা

রিয়ালিজম (Realism) সাহিত্যে এমন একটি আন্দোলন যা বাস্তব জীবন ও সমাজের স্বাভাবিক চিত্রকে উপস্থাপন করার চেষ্টা করে। এটি আবেগপ্রবণতা ও কল্পনাকে ছাড়িয়ে বাস্তব, দৈনন্দিন জীবনের চরিত্র, পরিস্থিতি ও সমাজের দিকগুলোকে চিত্রায়িত করে। রিয়ালিজম সাহিত্যে সাধারণ মানুষের জীবন, সমাজের অসাম্য, অর্থনৈতিক সমস্যা, শ্রেণিবিভেদ ও সামাজিক প্রথার নানা দিককে গুরুত্ব সহকারে উপস্থাপন করা হয়। ১৮শ শতকের শেষ দিকে ইউরোপে রিয়ালিজমের সূচনা ঘটে এবং ১৯শ শতকে এটি সাহিত্যের প্রধান ধারা হয়ে ওঠে।


১. রিয়ালিজমের প্রাথমিক পর্যায়

রিয়ালিজমের উদ্ভব মূলত ফরাসি সাহিত্যে হয়। ১৮শ শতকের শেষভাগে গস্তাভ ফ্লোবের (Gustave Flaubert) Madame Bovary (1857) রিয়ালিজমের প্রথম চমকপ্রদ উদাহরণ। ফ্লোবের কাজ বাস্তবতার সাথে সংবেদনশীলতা, চরিত্রের মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ এবং সমাজের অসঙ্গতি তুলে ধরে। ফ্লোবের রচনাশৈলী ছিল বিস্তারিত, নিরপেক্ষ এবং অত্যন্ত কাঠামোবদ্ধ।

সেই সময় ইউরোপীয় সমাজের মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের জীবনের জটিলতা সাহিত্যে উঠে আসে। সামাজিক প্রথা, পরিবার, অর্থনৈতিক চাপ এবং ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষার সংঘাত রিয়ালিজমে বিশদভাবে ফুটে ওঠে।


২. ১৯শ শতকের রিয়ালিজম

রিয়ালিজম ১৯শ শতকে সাহিত্যে পূর্ণ বিকাশ লাভ করে। এই সময়ে রাশিয়া, ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের সাহিত্যকে বিশেষভাবে উল্লেখ করা যায়।

  1. রাশিয়ান রিয়ালিজম:
    • লেখক: লিও তলস্তয় (War and Peace, Anna Karenina), ফিওদর দস্তয়েভস্কি (Crime and Punishment, The Brothers Karamazov)
    • বৈশিষ্ট্য: সামাজিক দ্বন্দ্ব, চরিত্রের গভীর মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ, নৈতিক সমস্যা, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অসাম্য।
  2. ফরাসি রিয়ালিজম:
    • লেখক: গস্তাভ ফ্লোবার, অনোরে দে বলজাক (La Comédie Humaine)
    • বৈশিষ্ট্য: বিশদ সামাজিক চিত্র, চরিত্রের বাস্তবসম্মত প্রতিফলন, আবেগ ও কল্পনার তুলনায় যৌক্তিক ও বাস্তবসম্মত উপস্থাপন।
  3. ইংরেজ রিয়ালিজম:
    • লেখক: চার্লস ডিকেন্স (Great Expectations, David Copperfield), থমাস হার্ডি (Tess of the d’Urbervilles)
    • বৈশিষ্ট্য: সাধারণ মানুষের জীবন, সমাজের অসাম্য, গ্রামীণ ও নগর জীবনের বাস্তবতা।

এই সময়কালকে রিয়ালিজমের “সোনালী যুগ” বলা হয়। কারণ সাহিত্যে সমাজের অসঙ্গতি, মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও মানসিক দ্বন্দ্ব প্রকৃতিভাবে প্রকাশিত হয়।


৩. রিয়ালিজমের বৈশিষ্ট্য

রিয়ালিজমকে অন্য সাহিত্যের ধারা থেকে আলাদা করে যেসব বৈশিষ্ট্য তা নিম্নরূপঃ

  1. বাস্তবতার প্রতি অঙ্গীকার:
    • রিয়ালিজমে কল্পনা ও অতিরঞ্জনকে বাদ দিয়ে দৈনন্দিন জীবন ও বাস্তব পরিস্থিতিকে উপস্থাপন করা হয়।
  2. চরিত্রের গভীরতা:
    • চরিত্র শুধু বাহ্যিক ক্রিয়া নয়, তাদের অভ্যন্তরীণ মনস্তত্ত্ব, মানসিক দ্বন্দ্ব ও সামাজিক প্রভাবের প্রতিফলন।
  3. সামাজিক প্রতিফলন:
    • সমাজের অসাম্য, শ্রেণিবিভেদ, অর্থনৈতিক সমস্যা ও নৈতিক দ্বন্দ্ব চিত্রায়িত হয়।
  4. নিরপেক্ষ বর্ণনা:
    • রচনায় লেখকের নিজস্ব অনুভূতি ও মূল্যায়ন সীমিত থাকে।
  5. ভাষা ও শৈলীর সরলতা:
    • জটিল কল্পনা ও অলঙ্কৃত ভাষা পরিহার করে সরল ও স্বাভাবিক ভাষার ব্যবহার।

৪. রিয়ালিজম থেকে ন্যাচারালিজমের বিকাশ

রিয়ালিজমের বিকাশের সঙ্গে যুক্ত ন্যাচারালিজমও লক্ষ্যযোগ্য। ন্যাচারালিজম রিয়ালিজমের পরবর্তী ধারা, যা মানুষের জীবন ও আচরণকে পরিবেশ, বংশগত বৈশিষ্ট্য ও সামাজিক পরিস্থিতির আলোকে বিশ্লেষণ করে। উদাহরণস্বরূপ:

  • লেখক: এমিল জোলায় (Germinal), স্টিভেন ক্রেন (Maggie: A Girl of the Streets)
  • বৈশিষ্ট্য: মানুষের সামাজিক ও শারীরিক বাস্তবতার চূড়ান্ত বিশ্লেষণ।

ন্যাচারালিজম রিয়ালিজমের তুলনায় আরও কঠোর, নির্দয় ও বিজ্ঞানসম্মত বাস্তবতা চিত্রায়ন করে।


৫. আধুনিক বিশ্বসাহিত্যে রিয়ালিজম

২০শ শতকের আধুনিক সাহিত্যে রিয়ালিজমের প্রভাব বজায় থাকে। যদিও মডার্নিজম ও পোস্টমডার্নিজম নতুন ধারার সৃজনশীলতা এনেছে, তবুও রিয়ালিজম সাহিত্যের ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত থাকে।

  • উদাহরণস্বরূপ, আমেরিকান সাহিত্যে আর্নেস্ট হেমিংওয়ে (The Old Man and the Sea) ও উইলিয়াম ফকনার (As I Lay Dying) দৈনন্দিন জীবনের বাস্তবতা, মানুষ ও সমাজের সম্পর্ককে তুলে ধরে।
  • ল্যাটিন আমেরিকান সাহিত্যেও গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ (One Hundred Years of Solitude) রিয়ালিজমের সঙ্গে ম্যাজিকাল রিয়ালিজমকে সংযুক্ত করেছেন।

এভাবে, আধুনিক বিশ্বসাহিত্যে রিয়ালিজম শুধু সামাজিক বাস্তবতা নয়, মানসিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতাকেও উপস্থাপন করছে।


৬. রিয়ালিজমের প্রভাব

  1. চরিত্র নির্মাণে গভীরতা: রিয়ালিজম চরিত্রের মানসিক, সামাজিক ও নৈতিক দিকগুলোকে উপস্থাপনে সাহিত্যে নতুন মাত্রা দেয়।
  2. সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি: সমাজের অসাম্য, দরিদ্রতা ও বৈষম্য রিয়ালিজম সাহিত্যে ফুটে ওঠে।
  3. ভাষা ও শৈলীর সরলতা: জটিল অলঙ্কার কমিয়ে পাঠককে সরাসরি বাস্তব জীবনের সঙ্গে সংযুক্ত করে।
  4. আধুনিক সাহিত্যের ভিত্তি: মডার্নিজম, পোস্টমডার্নিজম ও ম্যাজিকাল রিয়ালিজমের বিকাশে রিয়ালিজম মূল ভূমিকা রাখে।

বিশ্বসাহিত্যে রিয়ালিজমের বিকাশ মানবজীবন, সমাজ ও চরিত্রকে আরও বাস্তবসম্মতভাবে উপস্থাপন করেছে। রিয়ালিজম সাহিত্যে আবেগপ্রবণতা, অতিরঞ্জন ও কল্পনার চেয়ে দৈনন্দিন জীবন ও বাস্তব সমস্যার গুরুত্ব দেয়। ১৮শ এবং ১৯শ শতকে রিয়ালিজম সাহিত্যে ইউরোপীয়, রাশিয়ান ও আমেরিকান সাহিত্যিকদের মাধ্যমে সমাজ ও মানুষের চরিত্রকে চিত্রায়িত করেছে। আধুনিক সাহিত্যে রিয়ালিজম এখনও প্রভাবশালী, কারণ এটি মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতা ও সমাজের বিভিন্ন দিককে বোঝার একটি শক্তিশালী মাধ্যম।




Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *