বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ইতিহাস ও পরিবর্তন
বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান ধরে রেখেছে। এই সম্পর্কের ইতিহাস প্রায় এক শতাব্দী আগের পাকিস্তান ও ব্রিটিশ ভারতের যুগ পর্যন্ত বিস্তৃত। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা থেকে শুরু করে দু’দেশের সম্পর্ক নানা রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে পরিবর্তিত হয়েছে। সম্পর্কের ধারাবাহিকতা, চ্যালেঞ্জ এবং সহযোগিতার বিভিন্ন দিক অনুধাবন করলে দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান স্পষ্ট হয়।
১. স্বাধীনতার পূর্বাবস্থা
১৯৪৭ সালে ভারত ভাগ হওয়ার পর পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে সীমান্ত, নদী ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক নিয়ে অসংখ্য সমস্যা দেখা দেয়। পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমান বাংলাদেশ) এবং পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে বৈষম্য থাকায় পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ রাজনৈতিকভাবে ও অর্থনৈতিকভাবে প্রভাবিত ছিল। ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে সীমান্ত এবং নদী ব্যবহারকে কেন্দ্র করে শুরু হয় প্রথম সীমান্ত বিরোধ।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভারত শরণার্থী সংকট মোকাবিলা এবং মুক্তিকামী বাঙালিদের সহায়তায় সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে। ভারতের সামরিক, কূটনৈতিক ও মানবিক সহায়তার কারণে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সফল হয়। স্বাধীনতার পর দুই দেশের সম্পর্কের ভিত্তি স্থাপন হয়, তবে তা প্রায়শই রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থের দ্বারা প্রভাবিত হয়।
২. স্বাধীন বাংলাদেশের সাথে ভারতের প্রথম সম্পর্ক
১৯৭১ সালের পর ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করা হয়। ভারতের অবিলম্বে স্বাধীনতা স্বীকৃতি এবং শান্তি প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ দুই দেশের বন্ধুত্বের সূচনা। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ভারতকে কূটনৈতিকভাবে ধন্যবাদ জানান।
উভয় দেশ কূটনৈতিক, বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক স্থাপনে উদ্যোগী হয়। সীমান্তে সুষ্ঠু বাণিজ্য এবং নদী ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। তবে এই সময়ও দুটি দেশের মধ্যে কিছু অসঙ্গতি দেখা দেয়, যেমন সীমান্ত লঙ্ঘন এবং অভিবাসন সমস্যা।
৩. নদী ও জল সম্পদ নিয়ে দ্বন্দ্ব
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের একটি মূল চ্যালেঞ্জ হলো নদী ব্যবস্থাপনা। ১৯৭৫ সালে ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণ এবং গঙ্গা নদীর জল ব্যবস্থাপনাকে কেন্দ্র করে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশের কৃষি ও শিল্পে জল সঙ্কট দেখা দেয়। এর ফলে কূটনৈতিক পর্যায়ে আলোচনার প্রয়োজনীয়তা বৃদ্ধি পায়।
নদী ব্যবস্থাপনা শুধুমাত্র কৃষি ও শিল্পকে প্রভাবিত করে না, বরং দুই দেশের মধ্যকার রাজনৈতিক সম্পর্ককেও প্রভাবিত করে। সমঝোতার জন্য অনেকবার যৌথ কমিটি ও চুক্তি তৈরি হয়েছে। ত্রিপাক্ষিক চুক্তি, জলবণ্টন চুক্তি এবং যৌথ নদী ব্যবস্থাপনা কমিটি দুই দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
৪. অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক
বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাংলাদেশের-ভারতের সম্পর্কের মূল অংশ। স্বাধীনতার পর থেকে ভারত বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার হিসেবে বিবেচিত হয়। দুই দেশের মধ্যে আমদানি-রপ্তানি, শিল্প বিনিয়োগ এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নে সহযোগিতা বৃদ্ধি পেয়েছে।
বিশেষত দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সড়ক, রেলপথ ও বন্দরের সংযোগে ভারত গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগকারী। অর্থনৈতিক সহযোগিতা দুই দেশের মধ্যে আস্থা বৃদ্ধিতে সহায়ক হয়েছে। তবে কখনও কখনও সীমান্তে কর আদায়, বাণিজ্য সীমাবদ্ধতা এবং কাস্টমস ইস্যু দ্বন্দ্বের সৃষ্টি করে।
৫. রাজনৈতিক সহযোগিতা ও চ্যালেঞ্জ
দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্কও নানা প্রক্রিয়ার মধ্যে বিবর্তিত হয়েছে। জাতীয় নির্বাচনের সময়, সীমান্ত নিরাপত্তা, অভিবাসন এবং সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যৌথ উদ্যোগ প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়ায়।
বাংলাদেশের অভিবাসন সমস্যা ভারতের রাজ্যের মধ্যে চাপ সৃষ্টি করে। কখনও কখনও রাজনৈতিক উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। তবে নেতৃবৃন্দের মধ্যে সংলাপ ও সমঝোতা এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে। ২০০০-এর পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মধ্যে সম্পর্ক আরও দৃঢ় হয়েছে।
৬. সাংস্কৃতিক ও মানবিক সম্পর্ক
বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক কেবল রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক নয়; সাংস্কৃতিক বন্ধনও শক্তিশালী। দুই দেশের মানুষের মধ্যে ভাষা, সাহিত্য, ধর্ম ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ভাগাভাগি করে সম্পর্কের বন্ধন দৃঢ় হয়েছে। বিশেষত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম এবং অন্যান্য সাহিত্যিকদের কৃতিত্ব দুই দেশের মানুষের হৃদয়ে মিলন ঘটায়।
মানবিক সহযোগিতাও গুরুত্বপূর্ণ। প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় দুই দেশ একে অপরকে সহায়তা প্রদান করে। ১৯৭০-এর ঘূর্ণিঝড় এবং সাম্প্রতিক বন্যার সময় ভারত মানবিক সহায়তা প্রেরণ করেছে।
৭. ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক রক্ষা করার মাধ্যমে বাংলাদেশ আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে পারে। একই সঙ্গে চীনের প্রভাব বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটেও ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনৈতিক ব্লক, সিএসইএফ (সাউথ এশিয়ান ফ্রি ট্রেড এরিয়া) এবং বাণিজ্যিক নেটওয়ার্কে অংশ নিতে সক্ষম হয়েছে। এভাবে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব দুই দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
৮. সীমান্ত সমস্যা ও সমাধান
সীমান্ত সমস্যা, বিশেষত কক্সবাজার-ত্রিপুরা সীমান্ত, ভারতের অসম ও বাংলাদেশের কিছু অঞ্চল, দীর্ঘদিন সমস্যা তৈরি করেছে। ২০১৫ সালে বাংলাদেশ-ভারত দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যা নির্ধারিত সীমান্ত রেখা চূড়ান্ত করে। এর ফলে দু’দেশের মধ্যে সীমান্ত সংঘর্ষ ও মানবিক সমস্যা অনেকাংশে কমেছে।
৯. সাম্প্রতিক পরিবর্তন
২০০৯ সালের পর থেকে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক দৃঢ় হয়েছে। বিশেষত অবকাঠামোগত বিনিয়োগ, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও যোগাযোগ খাতে সহযোগিতা বৃদ্ধি পেয়েছে। ভারত বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগকারী এবং বাণিজ্যিক অংশীদার।
দুই দেশের মধ্যে রাজনৈতিক সমঝোতা, যৌথ নিরাপত্তা চুক্তি এবং সাংস্কৃতিক বিনিময় সম্পর্কের দৃঢ় ভিত্তি গড়েছে। নদী ব্যবস্থাপনা, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ও অভিবাসন ইস্যুতে নিয়মিত আলোচনার মাধ্যমে দ্বন্দ্ব সীমিত করা হয়েছে।
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক দীর্ঘ ইতিহাসের ধারক। এটি রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মাত্রায় বিবর্তিত হয়েছে। স্বাধীনতার পর থেকে সম্পর্কের উত্থান-পতন হয়েছে, তবে সমঝোতা ও সহযোগিতার মাধ্যমে দুটি দেশ আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে।
আঞ্চলিক অর্থনীতি, নিরাপত্তা, মানবাধিকার এবং সাংস্কৃতিক বিনিময়ে বাংলাদেশের ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভবিষ্যতে আরও শক্তিশালী কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
