ছয় দফা আন্দোলন: বাঙালির মুক্তির সনদ


ছয় দফা আন্দোলন: বাঙালির মুক্তির সনদ

বাংলাদেশের ইতিহাসে ছয় দফা আন্দোলন একটি বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে। এটি কেবল রাজনৈতিক দাবি-দাওয়ার সংগ্রাম নয়, বরং বাঙালি জাতির মুক্তি ও স্বঅধিকার প্রতিষ্ঠার এক অনন্য প্রতীক। ১৯৬৬ সালের ৫ই মার্চ শুরুর এই আন্দোলন পূর্ব পাকিস্তানে বাঙালির স্বশাসন ও অর্থনৈতিক স্বাতন্ত্র্যের জন্য গড়ে ওঠে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এই আন্দোলনের নেতা ছিলেন, এবং ছয় দফা ছিল বাঙালির স্বাধিকার অর্জনের মঞ্চ।

১. রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট

১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টি হলেও পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে বৈষম্য অব্যাহত থাকে। রাজনৈতিক ক্ষমতা ও অর্থনৈতিক সুবিধা মূলত পশ্চিম পাকিস্তানের হাতে কেন্দ্রীভূত ছিল। বাঙালিরা স্বশাসন এবং রাষ্ট্রীয় নীতি-নির্ধারণে অংশ নিতে পারছিল না। এ অবস্থায় বাঙালি জাতির অসন্তোষ গড়ে ওঠে, যা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে রূপ নেয়।

পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকরা বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকে অবমূল্যায়ন করতেন। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনই এ বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রথম বড় প্রতিবাদ হিসেবে গণ্য করা হয়। ভাষা আন্দোলন বাঙালির রাজনৈতিক চেতনা জাগ্রত করে। তারই ধারাবাহিকতায় ছয় দফা আন্দোলন আসে।

২. অর্থনৈতিক বৈষম্য ও কৃষি সমস্যা

পূর্ব পাকিস্তান ছিল দেশের বৃহত্তম জনসংখ্যা ও কৃষি উৎপাদন ক্ষেত্র। অথচ রাজস্ব ও শিল্প বিনিয়োগের ক্ষেত্রে পশ্চিম পাকিস্তান প্রাধান্য পায়। পূর্ব পাকিস্তান থেকে অর্জিত আয় পশ্চিম পাকিস্তানে খরচ হতো। ফলে বাঙালিরা তাদের সম্পদের ওপর নির্ভরশীল হতে পারছিল না।

কৃষকরা অত্যন্ত কষ্টে জীবন কাটাচ্ছিল। জমিদারি ও কর ব্যবস্থা ছিল একপাক্ষিক, যা পূর্বাঞ্চলের কৃষকদের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। উৎপাদিত ধান, গম ও তেলের মূল সুবিধা পশ্চিম পাকিস্তানের শহরগুলোতে চলে যেত। এর ফলে পূর্ব পাকিস্তান অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়ে, এবং বাঙালির মধ্যে অসন্তোষের বীজ বোনা শুরু হয়।

৩. ছয় দফার মূল বিষয়বস্তু

১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছয় দফা ঘোষণা করেন, যা পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসন, অর্থনৈতিক সমতা ও রাজনৈতিক স্বাধীনতার ভিত্তি স্থাপন করে। ছয় দফা নিম্নরূপ:

  1. কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতা সীমিতকরণ: অর্থনীতি, রাজস্ব, এবং বিনিয়োগের বিষয়ে সর্বপ্রধান সিদ্ধান্ত পূর্ব পাকিস্তান সরকার নিয়ন্ত্রণ করবে।
  2. মুদ্রা ও রাজস্ব ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ: পূর্ব পাকিস্তান তাদের রাজস্বের পুরো সুবিধা ভোগ করবে।
  3. বাণিজ্য ও শুল্কনীতি স্বাধীনকরণ: স্থানীয় শিল্প ও বাণিজ্যকে সমান সুযোগ দেওয়া হবে।
  4. পশ্চিম পাকিস্তান থেকে অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ নিয়ন্ত্রণ: পূর্ব পাকিস্তানের সম্পদ ও শিল্পে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকবে।
  5. কৃষি ও ভূমি সংস্কার: কৃষকের অধিকার সুরক্ষিত ও জমির ন্যায্য বণ্টন নিশ্চিত হবে।
  6. রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসন: কেন্দ্রীয় সরকারের শাসন সীমিত, পূর্ব পাকিস্তানের নিজস্ব সরকার ও সংবিধান প্রণয়ন সম্ভব হবে।

ছয় দফা আন্দোলন কেবল অর্থনৈতিক দাবি নয়, বরং রাজনৈতিক স্বাধীনতার সূচনা হিসেবে গণ্য হয়।

৪. আন্দোলনের সামাজিক প্রভাব

ছয় দফা আন্দোলন সামাজিকভাবে বাঙালির মধ্যে ঐক্যের শক্তি তৈরি করে। পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে যে বৈষম্য ছিল, তা জনগণের মধ্যে পরিষ্কারভাবে বোঝা যায়। শিক্ষিত যুবকরা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে। ছাত্রলীগ, শ্রমিক সংগঠন ও কৃষক সমিতি ছয় দফার জন্য সমর্থন প্রদান করে।

এই আন্দোলন পূর্ব পাকিস্তানের জনগণকে রাজনৈতিক সচেতন করে তোলে। জনগণের মধ্যে অধিকার ও স্বাধীনতার চেতনা বৃদ্ধি পায়। নারী ও যুবকরা বিশেষ ভূমিকা পালন করে, যা ভবিষ্যতে মুক্তিযুদ্ধের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।

৫. রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া

পশ্চিম পাকিস্তানের সরকার ছয় দফাকে কেন্দ্রীয়করণের বিপরীতে দেখে। তারা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাজনৈতিকভাবে নিগ্রহ ও হুমকির মুখে ফেলে। তবে এই আন্দোলন আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি পায় এবং পাকিস্তানের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

ছয় দফা আন্দোলন সরাসরি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পূর্বাভাস হিসেবে কাজ করে। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে এটি পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের মধ্যে জাতীয় চেতনা জাগ্রত করে।

৬. আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট

ছয় দফা আন্দোলনের সময় বিশ্বরাজনীতিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। শীতল যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের দৃষ্টি পাকিস্তানের ওপর ছিল। পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ সমস্যা আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখে পড়ে। ফলে পূর্ব পাকিস্তানের দাবি আন্তর্জাতিক পর্যায়েও গুরুত্ব পায়।

৭. ছয় দফা ও মুক্তিযুদ্ধের সম্পর্ক

ছয় দফা আন্দোলন বাঙালির রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতার ভিত্তি স্থাপন করে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের মূল কারণগুলোর মধ্যে ছয় দফা অন্যতম। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাঙালিরা রাজনৈতিক অধিকার, অর্থনৈতিক সমতা এবং স্বায়ত্তশাসনের দাবি স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। ছয় দফা আন্দোলন ছিল মুক্তি সংগ্রামের সনদ, যা পরে স্বাধীন বাংলাদেশের রূপায়ণে প্রভাব ফেলেছে।

৮. শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক প্রভাব

ছয় দফা আন্দোলন বাঙালি শিক্ষিত সমাজকে রাজনৈতিক সচেতন করে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সাহিত্য, নাটক ও কবিতার মাধ্যমে আন্দোলনের বার্তা ছড়িয়ে পড়ে। এই আন্দোলন বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে রাজনৈতিক চেতনার সংযোগ ঘটায়। ফলে বাঙালির মধ্যে ঐক্য ও জাতীয় চেতনা জাগ্রত হয়।

৯. সমাপ্তি

ছয় দফা আন্দোলন শুধুমাত্র পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দাবি নয়, এটি বাঙালির স্বাধীনতা আন্দোলনের ভিত্তি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আন্দোলনটি বাঙালির মুক্তি সংগ্রামের প্রতীক হিসেবে ইতিহাসে অমর। ছয় দফা আন্দোলন প্রমাণ করে যে, জনগণের একত্রিত চেষ্টাই জাতির স্বাধীনতা ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করতে পারে।

বাংলাদেশের মুক্তি ও রাষ্ট্রীয় স্থাপনার ক্ষেত্রে ছয় দফা আন্দোলনের অবদান অমূল্য। এটি কেবল রাজনৈতিক দল, নেতা বা সম্প্রদায়ের নয়, বরং সমগ্র বাঙালি জাতির সংগ্রামের ইতিহাসের অংশ। এই আন্দোলন বাঙালির ঐক্য, সংকল্প এবং স্বাধীনতার চেতনাকে যুগ যুগ ধরে স্মরণীয় করে রেখেছে।





Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *