১৯৭০-এর নির্বাচন ও বাঙালির আশা-নিরাশা
১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচন পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এই নির্বাচন বাঙালি জনগণের আশা এবং রাজনৈতিক চেতনার প্রতীক হয়ে ওঠে। আওয়ামী লীগের অসামান্য বিজয় বাঙালি জাতির স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে ত্বরান্বিত করে, কিন্তু পাকিস্তানি শাসকদের মানসিকতা ও রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র বাঙালির আশা ভেঙে দেয়। নির্বাচনের ফলাফল ও পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের পূর্বশর্ত হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
১. প্রেক্ষাপট
(ক) রাজনৈতিক অবস্থান
- ১৯৬৫ সালের ইন্দো-পাক যুদ্ধ ও পূর্ব-পশ্চিম পাকিস্তানের বৈষম্য
- পূর্ব পাকিস্তানের জনসংখ্যা প্রায় ৫ কোটি, কিন্তু রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতা পশ্চিম পাকিস্তানে
- আওয়ামী লীগের ৬ দফা রাজনৈতিক কর্মসূচি
(খ) সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি
- পূর্ব পাকিস্তানে শিল্প, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নয়নের অভাব
- পশ্চিম পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় শাসনের নীতি ও শোষণ
- বাঙালি জাতির রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি
২. ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচন
(ক) নির্বাচন কমিশন ও প্রক্রিয়া
- পাকিস্তান সরকার নির্বাচন পরিচালনার জন্য কমিশন গঠন
- গণনা ও ভোটদানের প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা
(খ) প্রধান রাজনৈতিক দল ও তাদের প্রার্থী
- আওয়ামী লীগ: শেখ মুজিবুর রহমান নেতৃত্বে ৬ দফা বাস্তবায়ন
- জাতীয় মুসলিম লীগ: কেন্দ্রীয় সরকারের সমর্থক
- অন্যান্য পার্টি: রাজনৈতিক বৈচিত্র্য
(গ) নির্বাচনের ফলাফল
- আওয়ামী লীগের দুর্দান্ত বিজয়: ১৬৫টি আসন (মোট ১৬৭টি পূর্ব পাকিস্তানের আসন)
- পশ্চিম পাকিস্তানের দলগুলোর তুলনায় সম্পূর্ণ পরাজয়
- নির্বাচনের ফলাফল পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের শক্তিশালী রাজনৈতিক প্রভাব প্রদর্শন
৩. বাঙালির আশা
(ক) রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসন
- আওয়ামী লীগের বিজয় বাঙালি জাতির স্বায়ত্তশাসনের প্রত্যাশা বাড়ায়
- ৬ দফার বাস্তবায়ন ও রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিতকরণ
(খ) অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন
- পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনৈতিক ও শিল্প উন্নয়নের আশা
- শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কৃষি খাতের উন্নয়ন
(গ) সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত মর্যাদা
- বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির স্বীকৃতি
- বাঙালি জাতীয় চেতনা বৃদ্ধি
৪. বাঙালির নিরাশা
(ক) পাকিস্তানি শাসকের আচরণ
- পশ্চিম পাকিস্তানের নেতৃত্ব নির্বাচনের ফলাফল মেনে নেয়নি
- রাজনৈতিক দমন নীতি গ্রহণ
(খ) ভোটফল প্রতিফলিত না হওয়া
- আওয়ামী লীগের বিজয় সত্ত্বেও ক্ষমতা হস্তান্তর ব্যর্থ
- পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ ন্যায় ও গণতান্ত্রিক অধিকার থেকে বঞ্চিত
(গ) রাজনৈতিক উত্তেজনা ও সংঘর্ষ
- ১৯৭০ সালের ডিসেম্বরে উত্তেজনা বৃদ্ধি
- পূর্ব-পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে দ্বন্দ্ব
- মুক্তিযুদ্ধের সূচনা ও ১৯৭১ সালের সংঘর্ষের পূর্বশর্ত
৫. আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট
(ক) ভারতের ভূমিকা
- শরণার্থী প্রস্তুতি ও মানবিক সহায়তা
- পাকিস্তান-ভারত সম্পর্কের প্রভাব
(খ) বিশ্বমিডিয়া ও কূটনীতি
- নির্বাচনের ফলাফল আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমে প্রচার
- বাঙালির নিরাশা ও গণঅধিকার লঙ্ঘনের তথ্য পৌঁছানো
৬. শিক্ষণীয় পাঠ
- গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ ক্ষমতার মালিক
- রাজনৈতিক চেতনাই স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচারের ভিত্তি
- আশা ভেঙে যাওয়া স্বাধীনতা আন্দোলনের সূচনা হতে পারে
১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচন বাঙালি জাতির ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ বাঁক। এটি বাঙালি জনগণের আশা এবং রাজনৈতিক চেতনার প্রকাশ, পাশাপাশি পাকিস্তানি শাসনের অবিচার ও রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের ফলে ঘটে যাওয়া নিরাশার চিহ্ন। নির্বাচন বাঙালি জাতির রাজনৈতিক সংহতি ও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা ত্বরান্বিত করে, যা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পূর্বশর্ত হিসেবে কাজ করে।
এই অধ্যায় আমাদের শেখায় যে গণতান্ত্রিক অধিকার, রাজনৈতিক সচেতনতা এবং জনগণের ঐক্য দেশের স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ। বাঙালির আশা-নিরাশা ১৯৭০-এর নির্বাচনে প্রমাণিত হয় যে রাজনৈতিক অধিকার না দেওয়া হলে জাতি সংগ্রামে বাধ্য হয়, যা শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতার পথে পরিচালিত করে।
