⭐ হালিমা খাতুন : জীবন ও সাহিত্যকর্ম
বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন, শিক্ষাচর্চা এবং শিশু সাহিত্যের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল নাম অধ্যাপক হালিমা খাতুন। তিনি ছিলেন ভাষাসৈনিক, শিক্ষাবিদ, গবেষক এবং সৃজনশীল শিশু সাহিত্যিক—যাঁর জীবন সংগ্রাম, প্রজ্ঞা ও সাহিত্যকর্ম বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছে। জীবনের প্রতিটি ধাপে তিনি ভাষা, শিক্ষা ও মানবমূল্যকে নেতৃত্বের শক্তি হিসেবে ধারণ করেছিলেন।
🌿 প্রারম্ভিক জীবন
- জন্ম: ২৫ আগস্ট ১৯৩৩
- জন্মস্থান: বাগেরহাট জেলা
পিতা মাওলানা আব্দুর রহমান এবং মাতা দৌলতুননেসা—দুজনই শিক্ষানুরাগী হওয়ায় তাঁর শৈশব পরিবেশ ছিল জ্ঞান, নীতি ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধে সমৃদ্ধ। ছোটবেলা থেকেই ভাষা, শিক্ষা ও সাহিত্য ছিল তাঁর গভীর আগ্রহের ক্ষেত্র।
🎓 শিক্ষাজীবন
হালিমা খাতুনের শিক্ষাযাত্রা ছিল বিস্তৃত, সমৃদ্ধ ও আন্তর্জাতিক গভীরতায় পূর্ণ।
- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্যে মাস্টার্স
- পরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে মাস্টার্স
- ১৯৬৮ সালে নর্দার্ন কলোরাডো বিশ্ববিদ্যালয় (যুক্তরাষ্ট্র) থেকে পিএইচডি
তার গবেষণার বিষয় ছিল শিক্ষা—যা পরবর্তী সময়ে শিক্ষা গবেষণা ক্ষেত্রে তাঁর দীপ্ত উপস্থিতিকে আরও শক্তিশালী করে।
🔥 ভাষা আন্দোলনে ভূমিকা
তিনি ছিলেন ভাষা আন্দোলনের সরাসরি অংশগ্রহণকারী একজন নারী ভাষাসৈনিক। ১৯৫২ সালের আন্দোলনের উত্তাল সময়ে তিনি মিছিল, প্রতিবাদ, সাংগঠনিক কার্যক্রমসহ ভাষার অধিকারের পথে সক্রিয় অবদান রাখেন। নারী হিসেবে ঝুঁকি নিয়েও তিনি রাস্তায় নেমে আসেন—যা ইতিহাসে সাহস ও দৃঢ়তার দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।
এই অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ তিনি পান—
- মরণোত্তর একুশে পদক (২০১৯)
- ভাষা সৈনিক সম্মাননা (বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি)
🏫 কর্মজীবন
হালিমা খাতুনের কর্মজীবন শিক্ষা গবেষণা, শিক্ষকতা এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে বিশেষ অবদানে উজ্জ্বল।
🔹 শিক্ষকতা
- খুলনা করনেশন স্কুল
- আর কে গার্লস কলেজ
এই দুটি প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করে তিনি শিক্ষা জীবনের ভিত্তিপ্রস্তর তৈরি করেন।
🔹 ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপন
তিনি পরে যোগ দেন
📘 শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (IER), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
এবং সেখানে অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত ছিলেন দীর্ঘদিন।
- গবেষণা
- পাঠক্রম উন্নয়ন
- শিক্ষা নীতি
—এসব ক্ষেত্রে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।
১৯৯৭ সালে তিনি অবসর গ্রহণ করেন।
✍️ সাহিত্যকর্ম
🔹 শিশু সাহিত্য
হালিমা খাতুন প্রধানত শিশু সাহিত্যিক হিসেবে পরিচিত। শিশুদের কল্পনা, নৈতিকতা, ভ্রমণ, আনন্দ ও সহমর্মীতাকে কেন্দ্র করে তাঁর রচিত গল্পগুলো বাংলাদেশের শিশু সাহিত্যে বিশেষ স্থান দখল করে আছে।
তিনি শিশুদের জন্য লিখেছেন—
- গল্প
- ছড়া
- অনুবাদগ্রন্থ
- নৈতিকমূল্যবোধভিত্তিক সাহিত্য
বাংলাদেশ শিশু একাডেমি তাঁর সাহিত্যকর্মকে উচ্চ মর্যাদায় মূল্যায়ন করেছে।
🔹 পুরস্কার
- বাংলাদেশ শিশু একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার
- লেখিকা সংঘ পুরস্কার
🏆 সম্মাননা
তাঁর অবদান স্বীকৃত হয়েছে জাতীয় পর্যায়ে:
- একুশে পদক (২০১৯, মরণোত্তর)
- ভাষা সৈনিক সম্মাননা
- শিশু ও নারীর উন্নয়ন, ভাষা আন্দোলন এবং শিক্ষাক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকায় আরও বহু সংস্থার সম্মাননা
🏡 ব্যক্তিগত জীবন
- একমাত্র মেয়ে: প্রজ্ঞা লাবনী
— যিনি আবৃত্তি শিল্পী ও প্রকাশক - ভাতিজী: সুবর্ণা মুস্তফা — বাংলাদেশের বিখ্যাত অভিনেত্রী
তার পারিবারিক শিকড়ও ছিল শিক্ষা, সংস্কৃতি ও কলার গভীর চর্চায় নিবেদিত।
🕯️ মৃত্যু
- তারিখ: ৩ জুলাই ২০১৮
- স্থান: ইউনাইটেড হাসপাতাল, ঢাকা
হৃদরোগ, বৃক্ক জটিলতা ও রক্তদূষণজনিত কারণে মৃত্যুবরণ করেন।
তাঁর প্রয়াণে দেশ হারায় ভাষা আন্দোলনের এক সাহসী কণ্ঠস্বর, একজন নিবেদিত শিক্ষাবিদ এবং সৃজনশীল সাহিত্যিককে।
⭐ মূল্যায়ন
অধ্যাপক হালিমা খাতুন ছিলেন—
- ভাষা, শিক্ষা ও সাহিত্যের পথিকৃৎ
- নারী নেতৃত্বের উজ্জ্বল আদর্শ
- শিশু–সাহিত্য সৃষ্টির এক অনন্য নির্মাতা
- বাঙালি জাতিসত্তা ও ভাষার একজন নিবেদিত রক্ষক
তার জীবন, কর্ম ও সাহিত্য আজও অনুপ্রাণিত করে।
