১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পরে স্বাধীন বাংলাদেশ বিশ্বের মানচিত্রে নবজাত রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল। স্বাধীনতার প্রথম দশক ছিল নানা রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ, অর্থনৈতিক সংকট এবং সামাজিক পুনর্গঠনের যুগ। তবে রাজনৈতিক অস্থিরতা, হত্যাযজ্ঞ, অভ্যুত্থান এবং সাংবিধানিক ভঙ্গের কারণে দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও স্থিতিশীলতা ধ্বংসপ্রায় হয়ে ওঠে। প্রথম প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান, যিনি স্বাধীনতা অর্জনের মূল নেতা হিসেবে জনগণের আস্থার প্রতীক ছিলেন, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট তার রাজনৈতিক জীবনের চরম নির্যাতনের শিকার হন।
এই হত্যাকাণ্ডের পর দেশে একটি স্থায়ী রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হয়, যা সামরিক শাসনের উত্থানকে ত্বরান্বিত করে। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর সেনাবাহিনী অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে। এই সময়ে বাংলাদেশে রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ সংঘাত, ক্ষমতার জন্য লড়াই, এবং গণতান্ত্রিক নীতির অবহেলা সাধারণ মানুষকে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার বাইরে ঠেলে দেয়। দেশের সাধারণ মানুষ স্বাধীনতার স্বাদ পেতে সক্ষম হলেও রাজনৈতিকভাবে তারা অসহায় বোধ করে। সামরিক শাসন মূলত রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার প্রয়াসে পরিচালিত হলেও এটি গনতান্ত্রিক অধিকার সীমিত করে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ করে এবং রাষ্ট্রীয় সংস্থা ও প্রশাসনকে একপ্রকার সেনা নিয়ন্ত্রণে আনে।
এই সময়ে রাজনৈতিক হত্যা, হঠাৎ অভ্যুত্থান, শাসন পরিবর্তন এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক দমন কার্যক্রম এক ধরনের সাধারণ জীবনযাত্রার নিয়মে পরিণত হয়। রাজনৈতিক দলগুলি ক্ষমতার জন্য প্রতিযোগিতা চালায় এবং জনগণ প্রায়শই রাজনৈতিক আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে। এই জটিল প্রেক্ষাপটে অর্থনৈতিক অবনতি, বৈদেশিক সাহায্যের উপর নির্ভরতা, শিল্প-শিল্প প্রতিষ্ঠানের পুনর্গঠন এবং শিক্ষার ক্ষেত্রে ভয়াবহ চ্যালেঞ্জ দেখা দেয়। সামরিক শাসন শাসন-ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা আনার চেষ্টা করলেও সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলির উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এই সময়ে রাজনৈতিক সংস্কার, নতুন সংবিধান প্রণয়ন, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন এবং রাজনৈতিক দলগুলোর পুনর্গঠন ঘটলেও, প্রায়শই তা সামরিক বাহিনীর দিকনির্দেশনায় সীমাবদ্ধ থাকে। অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে সাধারণ মানুষের ওপর দমনমূলক ব্যবস্থা, চাহিদা ও দাবির প্রয়োগে বাধা এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণের সুযোগ সীমিত থাকে।
দীর্ঘমেয়াদে এই সময়কাল বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক চেতনার বিকাশে গভীর প্রভাব ফেলে। সামরিক শাসন এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা বাংলাদেশকে একটি রাজনৈতিক শিক্ষা দেয়, যা পরবর্তীতে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংলাপ, গণতান্ত্রিক আন্দোলন এবং নাগরিক সচেতনতার ক্ষেত্রে নতুন জাগরণ সৃষ্টি করে। দেশের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক নীতি এই সময়ে বড় ধরনের প্রভাবিত হয়। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় প্রাথমিকভাবে সামরিক শাসনের সমালোচনা করে, তবে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের প্রয়াসে কিছু সহযোগিতা প্রদান করে। সামরিক শাসনের এই পর্যায়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি ধীরে ধীরে পুনর্গঠন করা হলেও, সাধারণ জনগণের জীবনযাত্রার মান খুব বেশি উন্নত হয়নি। রাজনৈতিক অস্থিরতা, অভ্যুত্থান, হত্যা এবং সামরিক শাসনের কারণে রাষ্ট্রের সংবিধানিক নিয়ম ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান কার্যকরভাবে কাজ করতে পারেনি।
সামরিক শাসন প্রত্যাহারের পরও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এবং ক্ষমতার লড়াই অব্যাহত থাকে। তবে এই সময়কালের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। মানুষের মধ্যে গণতান্ত্রিক চেতনা, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এবং জাতীয় চেতনা নতুন মাত্রা পায়। স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সামরিক শাসনের অধ্যায় একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা প্রদান করে যে, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক সংলাপ এবং সাধারণ জনগণের অংশগ্রহণ ছাড়া রাষ্ট্র স্থিতিশীল রাখা অত্যন্ত কঠিন। এই সময়কাল ইতিহাসে একটি শিক্ষণীয় অধ্যায় হিসেবে স্মরণীয় হয়ে আছে, যা পরবর্তী প্রজন্মের জন্য রাজনৈতিক সচেতনতা এবং গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
