বাংলা উপন্যাসে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ এমন এক নাম, যিনি পূর্ববাংলার সাহিত্যভূমিকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন। র্যাডক্লিফ রেখার পর জন্ম নেওয়া বাংলা সমাজ ও গ্রামীণ মুসলমান জীবনের বাস্তবতায় তাঁর উপন্যাস ছিল এক যুগান্তকারী পদচিহ্ন। বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে আবুল ফজল, আবু জাফর শামসুদ্দীন, শওকত ওসমান, শহীদুল্লা কায়সার বা আবু ইসহাক— এদের হাতে গ্রামীণ জীবনের চিত্র ফুটলেও, আধুনিক কৌশল ও গভীর শিল্পবোধসম্পন্ন একজন শক্তিশালী কথাশিল্পীর অভাব থেকেই গিয়েছিল। এই শূন্যতা ভাঙে লালসালু–এর প্রকাশে। উপন্যাসটি আধুনিক বাংলা কথাসাহিত্যের একটি বাঁকবদলের সূচনা।
হাসান আজিজুল হক তাঁর কথাসাহিত্যের কথকতা গ্রন্থে বলেন— বাংলাদেশি উপন্যাসে যে প্রথম সত্যিকার ‘সচেতন শিল্পীর’ পদার্পণ ঘটে, তার কেন্দ্রে ওয়ালীউল্লাহর নাম। তাঁর রচনায় জীবনের বাস্তবতা, আধুনিক শিল্পরীতি, গভীর তীক্ষ্ণতা, সংযমী অথচ প্রভাবশালী ভাষা—সব মিলেই আধুনিক উপন্যাসের পূর্ণতা দেখা যায়। লালসালু প্রকাশের মধ্য দিয়েই বাংলাদেশের উপন্যাস এক নতুন ধারায় প্রবেশ করে।
১৯৪৮ সালে প্রকাশের পর থেকেই লালসালু–র আধুনিকতার দিকটি সাহিত্যমহলে আলোচিত হতে থাকে। ফ্রয়েড, কাফকা, জয়েস বা কামুর মতো ইউরোপীয় আধুনিকদের প্রভাব এতে স্পষ্ট। ওয়ালীউল্লাহ মনোবিশ্লেষণের আধুনিক তত্ত্বকে ব্যবহার করেন চরিত্রের অন্তর্জগৎ বুঝতে। এটাই তাঁর সাহিত্যিক আধুনিকতার এক দিক; অপরদিকে পাভলভীয় মনস্তত্ত্ব ও বস্তুবাদী বাস্তবতা তাঁর দৃষ্টিকে গড়ে দেয়। লালসালু মূলত প্রথম ধরনের আধুনিকতার প্রতিনিধিত্ব করে—কুসংস্কার ও ভয়কে বুঝে মানুষের মনে ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া ফুটিয়ে তোলে।
উপন্যাস প্রকাশের সময় পাকিস্তান刚刚 দ্বিজাতিতত্ত্বের উন্মাদনায় নিমজ্জিত রাষ্ট্র। ধর্মভিত্তিক রাজনীতির অন্ধতা তখন সমাজজীবনকে গ্রাস করছে। এরই মধ্যে ওয়ালীউল্লাহ যে শিল্পিত সাহস নিয়ে ধর্মব্যবসার মুখোশ উন্মোচন করেন তা ছিল অভাবনীয়। বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় লালসালু অজ্ঞতা ও ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে এক কঠিন প্রয়াস। শিবনারায়ণ রায় মন্তব্য করেছেন— জীবনের ভয় ও অলৌকিক বিশ্বাসকে কাজে লাগিয়ে এক উপার্জনহীন মানুষ কিভাবে ‘খোদার কালাম’কে ব্যবসায় রূপ দেয়—বাংলা সাহিত্যে ওয়ালীউল্লাহর মতো সাহসীভাবে কেউ এটিকে তুলে ধরেননি। হিন্দু আশ্রম বা বাবাদের নিয়ে আগে লেখা হলেও মুসলিম পীরতন্ত্রকে আঘাত করা ছিল অসীম ঝুঁকিপূর্ণ কাজ—ওয়ালীউল্লাহ সেই ঝুঁকিই নেন।
পরবর্তী প্রজন্মও ধর্মতন্ত্রকে আঘাত করেছে— যেমন হুমায়ুন আজাদের পাক সার জমিন সাদ বাদ, যেখানে ধর্মীয় ভণ্ডামির নগ্ন সত্য উন্মোচন হয়েছে। তবে শিল্পমানের নিরিখে লালসালু–র পরিমিতি ও চরিত্র নির্মাণের গভীরতা অন্যদের ঊর্ধ্বে। ধর্মান্ধ সমাজে এটি তীক্ষ্ণ অস্ত্রের মতো কাজ করেছে—চরিত্র, ভাষা, পরিবেশচিত্র—সব মিলিয়ে।
উপন্যাসের শুরুতেই মহব্বতনগর গ্রামের পরিবেশ আমাদের সামনে আসে— ক্ষুধা, ফসলের অভাব, অথচ ধর্মীয় উন্মাদনার প্রাচুর্য। শিশুরা কোরআন মুখস্থ করে, অল্প বয়সে ‘হাফেজ’ হয়—ধর্ম তাদের সামাজিক মর্যাদার পথ। ওয়ালীউল্লাহ এখানে একজন সমাজ-মানবতাত্ত্বিকের পর্যবেক্ষণশক্তি প্রয়োগ করেন। গ্রামবাসীর মানসিক গঠন, অর্থনৈতিক দুর্বলতা ও ধর্মবোধের দুর্বলতার সঙ্গে চরিত্রদের দ্বন্দ্ব এক অমোঘ দৃশ্যের মতো উন্মোচিত হয়।
মজিদের প্রবেশ ঘটে নাটকীয়ভাবে। গ্রামে সচ্ছলতার জন্য সে নেয় ‘ভয়’–ভিত্তিক কৌশল। এক জীর্ণ কবরকে ‘মোদাচ্ছের পীরের’ মাজার ঘোষণার পর গ্রামের দরিদ্র মানুষ গভীর অপরাধবোধে আক্রান্ত হয়। খালেক ব্যাপারীর অর্থবল ও মজিদের ধর্মীয় মুখোশ—এই জোট গ্রামবাসীর উপর কর্তৃত্ব কায়েম করে। লালসালু দিয়ে মাজার সাজানো হয়; মজিদ ঘর, জমি, স্ত্রীর মালিক হয় সহজেই। রহিমা—ভীরু ও গৃহস্থ নারীর প্রতীক—মজিদের ক্ষমতার সঙ্গে মাজারের ছায়ার মত যুক্ত হয়ে যায়।
মজিদের শাসন গ্রামে সর্বব্যাপী। বয়স্ককে অপমান, পিতা–পুত্রের জোর করে খৎনা—এই নির্মমতা সবাই মেনে নেয়। কারণ, তারা রহিমার মতো—ভীতু ও নির্ভরশীল, দুঃখে ঈশ্বরের স্মরণে ফিরে আসে।
মজিদের ক্ষমতা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে অন্য পীরের আগমনে। তিনি গ্রামবাসীর আকর্ষণ পান। মজিদ ভয় পায়—কারণ সে জানে ভণ্ডামি কিভাবে কাজ করে। তার অনুসারীরা হামলা চালায়; ব্যর্থ হয়। সেই পীর শেষমেশ গ্রাম ছাড়েন। আমেনা বিবিকে সন্তানের আশায় পীরের ‘পানিপড়া’ খেতে দেওয়ায় মজিদের অহংকার আহত হয়। সে খালেককে বাধ্য করে তালাক দিতে—ভয় ও ধর্মের নামে একটি জীবনের ধ্বংস ঘটানো হয়।
অন্যদিকে আক্কাস—পরিণত ও শিক্ষিত যুবক—গ্রামে স্কুল গড়তে চান। মজিদ আতঙ্কিত। মানুষের অজ্ঞতা তার অস্ত্র; স্কুল মানে ভাঙনের শুরু। সে সামাজিক অপমান দিয়ে আক্কাসকে থামিয়ে মসজিদ নির্মাণের ঘোষণা দেয়—লোকজনও তাতে সম্মতি দেয়।
কিন্তু ক্ষমতার কেন্দ্রে মজিদের আত্মা ক্রমে একা হয়ে যায়। মাজার যে তার শক্তি—সেই কবরের দিকে তাকিয়ে ভয় পায় সে। কোন মৃতদেহকে কাজে লাগিয়ে সে সমাজ শাসন করছে? প্রশ্নটি তাকে ছিন্নভিন্ন করে।
যৌন হতাশা ও নৈঃসঙ্গ্য তাকে গ্রাস করে। শয়নে রহিমা তাকে পূরণ করতে পারে না। অথচ আমেনা বিবির শরীর, হাসুনির মায়ের নগ্ন হাড়িপিঠ—তাকে দগ্ধ করে। এই কামনা দমনের জন্য সে আবার বিয়ে করে—জমিলাকে।
জমিলা—উপন্যাসের সবচেয়ে বীর চরিত্র। রহস্যময়, অবাধ, বিদ্রোহী। সে হাসে, হুমকিতে ভয় পায় না, ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা উপেক্ষা করে, ঘোমটা ছাড়াই হাঁটে—মজিদের কর্তৃত্ব ভেঙে দেয়। মজিদ তাকে ভয় দেখাতে চায়; জমিলা তা উড়িয়ে দেয়। যখন তাকে পাঁজাকোলা করে টানতে চায়, সে তার মুখে থুথু ছুঁড়ে মারে—এটাই গ্রামে প্রথম প্রতিরোধ।
মজিদ জমিলাকে রাতে মাজারে বেঁধে রেখে ভয় দেখাতে চায়। বাইরে ঝড়—ভেতরে মজিদের ক্ষমতা ভেঙে পড়ার অঘোষিত মুহূর্ত। রহিমা—যে এতদিন নিখাদ আনুগত্যের প্রতীক ছিল—প্রথমবার মানুষিকতার ভাষায় প্রতিবাদ করে। মজিদ পরাজিত হয়।
মাজারে ফিরে সে দেখতে পায় জমিলা অর্ধনগ্ন—একটি পা মাজারের উপর। এই দৃশ্যে ধ্বংস হয় মজিদের কর্তৃত্ব। গ্রামবাসীও তার ভূয়া ঈশ্বরত্ব অস্বীকার করতে শুরু করে। ঝড়ে ধান নষ্ট হয়; মানুষ সমাধান চায়। মজিদ বলে—‘খোদার উপর ভরসা রাখো।’ এই কথা সে তাদের নয়—নিজেকেই বলে। পতনের মুখে একমাত্র আশ্রয়—ভুল বিশ্বাস।
লালসালু আজকের সময়েও সমান প্রাসঙ্গিক। ধর্মের নামে ব্যবসা, কুসংস্কার, সাম্প্রদায়িকতা—সমাজের অবক্ষয়কে ওয়ালীউল্লাহ উন্মোচন করেছেন। তিনি ধর্মবিশ্বাস নয়, ধর্মব্যবসাকে আক্রমণ করেছেন। লাল কাপড়ে ঢাকা মাজার আসলে মানুষের বিবেককে ঢাকা দেয়—ঔপন্যাসিক সেই আবরণ ছিঁড়ে দেখিয়েছেন।
এ উপন্যাসের সাফল্য শুধু শিল্পে নয়—বাস্তবিক প্রভাবেও। অন্ধ ধর্মবিশ্বাসে আক্রান্ত সমাজকে জাগানোর জন্য প্রয়োজন ছিল এমন স্পর্ধা। সেই সাহসেই লালসালু বাংলা সাহিত্যে স্থায়ী আসন পায়।
