লালসালু উপন্যাসের চরিত্র বিশ্লেষণ
১. মজিদ
উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র। সকল ঘটনার নিয়ন্ত্রক। কুসংস্কার, শঠতা ও অন্ধবিশ্বাসের প্রতীক। মহব্বতনগর গ্রামে নাটকীয়ভাবে প্রবেশ করে নিজের ক্ষমতা বিস্তার করে। রহিমা (১ম স্ত্রী) ও জমিলা (২য় স্ত্রী) তার পরিবার। আক্কাস আলীর স্কুল প্রতিষ্ঠার চেষ্টা নস্যাৎ করে তাকে গ্রাম ছাড়া করে।
উক্তি:
- “মুসলমানের মাইয়ার হাসি কেউ কখনো হুনে না। তোমার হাসিও যেন কেউ না হুনে।”
- “হে আমার মুখে থুথু দিল!”
- “তুমি না মুসলমানের ছেলে—দাড়ি কই তোমার?”
- “তোমার এত দুঃসাহস? তুমি জায়নামাজে ঘুমাইছ?”
- “কও বিবি, কী করলাম? আমার বুদ্ধিতে জানি কুলায় না।”
- “দুনিয়াটা বিবি বড় কঠিন পরীক্ষাক্ষেত্র… দয়মায়া যেন তোমারে আন্ধা না করে।”
- “নাফরমানি করিও না। খোদার ওপর তোয়াক্কল রাখ।”
২. রহিমা
মজিদের প্রথম স্ত্রী। শক্ত ধারণার আড়ালে ভীতু ও সংযত স্বভাবের নারী। অত্যন্ত অনুগত এবং গ্রামের সাধারণ নারীর প্রতীক। বারো বছর মজিদের সংসার করেছে।
উক্তি:
- “ধান দিয়া কী হইব, মানুষের জান যদি না থাকে?”
- “কী করলা বইন তুমি, কী করলা!”
- “জোরে হাইস না বইন, মাইনষে হুনবো।”
৩. জমিলা
মজিদের দ্বিতীয় স্ত্রী। চঞ্চল, স্বাধীনচেতা এবং কুসংস্কার-বিমুখ। জিকিরের সময় বাইরে আসায় তাকে ‘ঝি’ সম্বোধন করে তাড়ানো হয়। মজিদ তাকে জিনে ধরেছে মনে করে মাজারে বেঁধে রাখে।
উক্তি:
- “একটা মজার কথা মনে পড়ল বইলাই হাসলাম বুবু।”
- “এইখানে তোমারে দেইখা ভাবলাম তুমি বুঝি শাশুড়ি।”
৪. খালেক ব্যাপারী
গ্রামের দায়িত্বশীল চরিত্র। মসজিদ নির্মাণে বড় ভূমিকা। মজিদের কুমন্ত্রণায় ১৩ বছরের সংসার ভেঙে প্রথম স্ত্রীকে তালাক দেয়।
উক্তি:
- “দিনভর রোজা রাখনে বড় দুর্বল হইছিল তানি।”
- “আপনে কী কিছু সন্দেহ করেন?”
- “এহন কও, হেই কথা তুমি ঢাকবার চাও কেন?”
৫. আমিনা
খালেক ব্যাপারীর প্রথম স্ত্রী। নিঃসন্তান হওয়ায় পানি পড়া খেতে চায় কিন্তু মজিদ তা বাধা দেয় ও তাকে তালাক করায়।
৬. তানু
খালেক ব্যাপারীর দ্বিতীয় স্ত্রী। প্রতিবছর সন্তান জন্ম দেয়।
৭. পির সাহেব (আউয়ালপুরের পির)
বংশানুক্রমিক পির। দুর্বল ও বৃদ্ধ। দাঙ্গা পছন্দ করেন না।
উক্তি:
- “কুত্তা তোমাকে কামড় দিলে তুমিও কি তাকে কামড়াবে?”
৮. ধলা মিয়া
তানুর ভাই। বোকাসুলভ, পরগাছা প্রকৃতি। মজিদের কাছে খবর ফাঁস করে।
উক্তি:
- “কী কাম দুলা মিয়া?”
৯. মোদাব্বের মিয়া
আক্কাসের বাবা। রাগ উঠলে তোতলায়।
১০. আক্কাস
গ্রামের শিক্ষিত যুবক। ইংরেজিতে পড়াশোনা করা। স্কুল প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল কিন্তু মজিদ বাধা দেয়।
উক্তি:
- “আপনি যা শুনেছেন তা সত্য।”
- “ইংরেজি না পড়লে চলব ক্যামনে?”
১১–১২. দুদু মিঞা ও তার ছেলে
দুদু মিঞা সাত ছেলের বাবা, অত্যন্ত সরলমনা।
ছেলে বাবাকে দেখে বারবার হাসে।
বিখ্যাত উক্তি: “আমি গরিব মুরুক্ষ মানুষ।”
১৩. নানি-বুড়ি
নতুন শিশুর জন্মে যার দরকার হয়।
১৪. হাসুনির মা
বিধবা, দরিদ্র নারী। বিয়েতে অনীহা, শ্বশুরবাড়িকে ঘৃণা করে। ধানভানার কাজ করে।
১৫. কম্পাউন্ডার
করিমগঞ্জের হাসপাতালে কর্মরত। মজিদ তাকে ডাক্তার ভাবে।
১৬. তাহের-কাদের
হাসুনির মার ভাই। স্বার্থান্ধ স্বভাব।
১৭. মোদচ্ছের পির
মজিদের ভণ্ডামির প্রতীকী অবলম্বন।
১৮. রতন
তাহের-কাদেরদের কনিষ্ঠ ভাই।
১৯. বুড়ো
হাসুনির মায়ের ছেলে। স্ত্রীকে মারধোর করে—পরিণতিতে নিজেই নিঃস্ব হয়ে যায়।
২০. বুড়ি
তাহের কাদেরদের মা। অপবাদে ভেঙে যাওয়া জীবন।
২১–৩৬. অন্যান্য চরিত্র
সলেমানের বাপ, কানুর বাপ, মতলব খাঁ, খ্যাংটা বুড়ি, খেটানির মা, খোদেজা, সরকারি কর্মচারী, খোনকার মোল্লা, ছুনুর বাপ, কালু মিয়া, ছমিরুদ্দিন—
গ্রামের জীবন, ধর্মাচরণ, কুসংস্কার ও সমাজব্যবস্থার বিভিন্ন দিককে প্রতিফলিত করে।
স্পেশাল উক্তিসমূহ
- শস্যের চেয়ে টুপি বেশি, ধর্মের আগাছা বেশি।
- খোদার এলেমে বুক ভরে না—তলায় পেট শূন্য বলে।
- বিশ্বাসের পাথরে যেন খোদাই সে–চোখ।
