রোহিঙ্গা সংকট: ইতিহাস, রাজনীতি ও কূটনীতি
রোহিঙ্গা সংকট দক্ষিণ এশিয়ার একটি দীর্ঘস্থায়ী মানবিক ও রাজনৈতিক সমস্যা। মায়ানমারের রাখাইন প্রদেশের মুসলিম সংখ্যালঘু রোহিঙ্গারা দীর্ঘকাল ধরে নিপীড়নের শিকার। ধর্মীয় ও জাতিগত বৈষম্য, রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি না থাকা, রাজনৈতিক দমন এবং সামাজিক বৈষম্যের কারণে রোহিঙ্গারা তাদের মাতৃভূমি ত্যাগ করতে বাধ্য হয়। বিশেষত ২০১৭ সালের সংহতি-প্রক্রিয়ার সময় বাংলাদেশের সীমান্তে লাখ লাখ রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে। এই সংকট কেবল মানবিক নয়, বরং আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক কূটনীতিতেও গভীর প্রভাব ফেলে।
১. রোহিঙ্গা সংকটের ইতিহাস
রোহিঙ্গারা মূলত রাখাইন প্রদেশে বসবাসকারী আরাকানী মুসলিম জনগোষ্ঠী। ইতিহাস অনুযায়ী, তারা ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে মায়ানমারে বসতি স্থাপন করেছিল। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের সময় এ অঞ্চলে সংখ্যালঘু মুসলিম এবং সংখ্যালঘু বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মধ্যে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য সৃষ্টি হয়।
মায়ানমার স্বাধীন হওয়ার পর সংবিধান ও নাগরিক আইনের মধ্যে রোহিঙ্গাদের স্বীকৃতি সীমিত হয়। ১৯৮২ সালের নাগরিক আইন অনুসারে রোহিঙ্গাদের “অন্যদেশীয়” হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ফলে তারা ভোটাধিকার, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং ভূমির অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়।
২. রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট
রোহিঙ্গারা দীর্ঘদিন ধরে রাখাইনে রাষ্ট্রীয় দমন ও সামাজিক বৈষম্যের শিকার। সেনা অভিযান, গ্রামে অগ্নিসংযোগ, হত্যা ও লুটপাটের ঘটনা নিয়মিতভাবে ঘটেছে। এ কারণে রোহিঙ্গারা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগে এবং তাদের দেশের মধ্যে বসবাস করা অসম্ভব হয়ে যায়।
মায়ানমারের সেনা এবং রাজনৈতিক নেতৃত্ব রোহিঙ্গাদের সংখ্যালঘু ও হুমকিপূর্ণ হিসেবে দেখেছে। জাতিগত ও ধর্মীয় বিভাজন এই সংকটকে দীর্ঘস্থায়ী করেছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা এ ধরনের নিপীড়নের তথ্য সরবরাহ করে আসছে।
৩. বাংলাদেশে রোহিঙ্গা আগমন
২০১৭ সালের আগস্টে রাখাইনে সেনা অভিযান এবং সহিংসতার কারণে প্রায় ৭ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করে। মূলত কক্সবাজারের সীমান্ত অঞ্চলে তারা আশ্রয় নেয়। শরণার্থী শিবিরগুলো অত্যন্ত অস্থায়ী এবং ঘনত্বপূর্ণ। খাদ্য, পানি, চিকিৎসা এবং শিক্ষা সমস্যার সঙ্গে তারা জীবন কাটাচ্ছে।
বাংলাদেশের স্থানীয় জনগণও এই অভ্যন্তরীণ চাপ অনুভব করছে। পরিবেশগত প্রভাব, ভূমি ব্যবহার এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে চাপ তৈরি হয়েছে।
৪. আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও কূটনীতি
রোহিঙ্গা সংকট আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ। জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থা মানবিক সহায়তা প্রদান করছে। জাতিসংঘে বাংলাদেশ মায়ানমারের বিরুদ্ধে চাপ সৃষ্টি করেছে এবং রোহিঙ্গাদের অধিকার সুরক্ষার আহ্বান জানিয়েছে।
চীনের ভূমিকা ও রাশিয়ার কূটনৈতিক সমর্থন মায়ানমারের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ। ফলে দক্ষিণ এশিয়ার কূটনীতি জটিল হয়েছে। বাংলাদেশের কূটনীতিকরা আন্তর্জাতিক চাপ ব্যবহার করে রোহিঙ্গাদের জন্য সহায়তা নিশ্চিত করতে কাজ করছে।
৫. মানবিক সমস্যা
রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে শিশু, নারী ও বয়স্করা সবচেয়ে দুর্বল। স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, খাদ্য ও নিরাপত্তার সমস্যা গভীর। জলবায়ু ও বন্যার কারণে শিবিরগুলো অতিরিক্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
শরণার্থীদের জীবনের মান উন্নয়ন করতে বাংলাদেশের সরকার ও আন্তর্জাতিক সংস্থা বিভিন্ন প্রকল্প চালু করেছে। তবে এই সংকট দীর্ঘস্থায়ী হওয়ায় সমাধান এখনো সম্পূর্ণ হয়নি।
৬. বাংলাদেশ-রোহিঙ্গা কূটনীতি
বাংলাদেশ রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় কূটনৈতিক ও মানবিক নীতি গ্রহণ করেছে। মায়ানমার সরকারকে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনের আহ্বান জানানো হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংস্থা ও doner দেশের সঙ্গে সমন্বয় করে শরণার্থী ব্যবস্থাপনা এবং পুনর্বাসন পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ সীমান্তে নিরাপত্তা, শিবির ব্যবস্থাপনা এবং মানবিক সহায়তা সমন্বয় করে সংকট নিয়ন্ত্রণে রাখছে।
৭. সমাধান ও ভবিষ্যৎ
রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান কেবল কূটনীতি ও রাজনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে সম্ভব। মায়ানমার সরকারকে নাগরিক অধিকার প্রদান, নিরাপদ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত এবং জাতিগত বৈষম্য দূর করতে হবে।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপ, কূটনৈতিক সমঝোতা এবং মানবিক সহায়তা সংকট মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বাংলাদেশও শরণার্থীদের নিরাপত্তা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করে ভূরাজনৈতিক দায়িত্ব পালন করছে।
৮. উপসংহার
রোহিঙ্গা সংকট একটি মানবিক, রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ। ইতিহাস, জাতিগত বৈষম্য এবং মায়ানমারের দমনমূলক নীতি এই সংকটকে দীর্ঘস্থায়ী করেছে। বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক ও মানবিক ভূমিকা আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ।
দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতা, মানবাধিকার রক্ষা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে রোহিঙ্গা সংকট সমাধান একটি বড় দায়িত্ব। বাংলাদেশের পদক্ষেপ, আন্তর্জাতিক চাপ এবং কূটনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব।
