মেঘ কেন বিভিন্ন প্রকারের হয়?

মেঘ কেন বিভিন্ন প্রকারের হয়?

আকাশে আমরা কখনও তুলোর মতো সাদা মেঘ, কখনও বিশাল কালো ঝড়ো মেঘ, আবার কখনও ছাতার মতো পাতলা পর্দার মতো মেঘ দেখি। এদের প্রত্যেকের আকার, রঙ, উচ্চতা ও গঠনের ধরন আলাদা। প্রশ্ন হলো—মেঘ কেন বিভিন্ন প্রকারের হয়? এর উত্তর লুকিয়ে আছে বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা, আর্দ্রতা, উচ্চতা, বাতাসের সঞ্চালন ও জলীয় বাষ্পের আচরণে।


১. মেঘের উচ্চতা ভেদে ভিন্নতা

মেঘের শ্রেণিবিভাগের অন্যতম প্রধান কারণ হলো উচ্চতা। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের বিভিন্ন স্তরে তাপমাত্রা ও বাতাসের ঘনত্ব এক নয়। ফলে একই জলীয় বাষ্প ভিন্ন উচ্চতায় ভিন্ন আকৃতির মেঘ তৈরি করে।

উচ্চ স্তরের মেঘ (২০,০০০ ফুটের ওপরে)

তাপমাত্রা খুব কম হওয়ায় এসব মেঘ বরফকণায় গঠিত।
উদাহরণ: সিরাস (Cirrus), সিরোস্ট্রাটাস, সিরোকিউমুলাস।

মধ্যম স্তরের মেঘ (৬,৫০০–২০,০০০ ফুট)

এগুলো বরফ ও পানিকণা—দুটোই হতে পারে।
উদাহরণ: অল্টোস্ট্রাটাস, অল্টোকিউমুলাস।

নিম্ন স্তরের মেঘ (৬,৫০০ ফুটের নিচে)

এগুলো প্রধানত জলকণায় গঠিত, তুলনামূলক ঘন।
উদাহরণ: স্ট্রাটাস, স্ট্রাটোকিউমুলাস।

উল্লম্বভাবে বিস্তৃত মেঘ

আকাশের নিচ থেকে অনেক ওপরে উঠে যায়।
উদাহরণ: কিউমুলোনিম্বাস (ঝড়ের মেঘ), কিউমুলাস।


২. তাপমাত্রার ভিন্নতা

তাপমাত্রা কম হলে জলীয় বাষ্প বরফকণায় রূপ নেয়, ফলে মেঘ হয় পাতলা ও সাদা যেমন সিরাস
তাপমাত্রা বেশি হলে জলবিন্দু তৈরি হয়, যা মেঘকে ঘন, গাঢ় রঙের যেমন নিম্বোস্ট্রাটাস বানায়।


৩. বাতাসের সঞ্চালন ও গতি

বাতাস উপরে উঠলে ঠান্ডা হয় এবং বাষ্প ঘনীভূত হয়ে মেঘ তৈরি করে।

  • দ্রুত ঊর্ধ্বমুখী বাতাস → মেঘ উঁচুতে উঠে টাওয়ারের মতো হয় (কিউমুলোনিম্বাস)।
  • ধীরে উত্থান → মেঘ পাতলা, চাদরের মতো হয় (স্ট্রাটাস)।
  • ঘূর্ণাবর্ত বা অস্থির বাতাস → তুলোর মতো ভাঙা ভাঙা মেঘ (কিউমুলাস)।

৪. আর্দ্রতার পরিমাণ

যেখানে আর্দ্রতা বেশি সেখানে মেঘ ঘন হয় ও রঙ গাঢ় হয়।
আর্দ্রতা কম হলে মেঘ পাতলা ও ছড়িয়ে পড়ে।


৫. বায়ুমণ্ডলীয় চাপের ভূমিকা

উচ্চচাপ অঞ্চলে মেঘ কম গঠিত হয়; নিচু চাপ অঞ্চলে মেঘ হয় বেশি।
নিম্নচাপ এলাকাগুলোতে সাধারণত বৃষ্টি–ঝড়ের মেঘ তৈরি হয়।


৬. জলীয় বাষ্পের উৎস

সমুদ্র, নদী, হ্রদ, বন—যেখানেই বাষ্প বেশি, সেখানেই মেঘের ধরনও ভিন্ন।
সমুদ্রের উপর সাধারণত বড়, ঘন, বৃষ্টি-ভরা মেঘ তৈরি হয়।


৭. মেঘের রঙের কারণ

  • সাদা মেঘ: সূর্যের আলো সমানভাবে প্রতিফলিত হয়।
  • ধূসর বা কালো মেঘ: ভিতরে জলবিন্দু বেশি, আলো প্রবেশ করতে পারে না।
    এ কারণে বৃষ্টির মেঘ সাধারণত কালচে হয়।

মেঘের প্রকারভেদ মূলত এর উচ্চতা, তাপমাত্রা, আর্দ্রতা, বাতাসের গতি ও জলীয় বাষ্পের ঘনত্বের উপর নির্ভর করে। তাই কখনও আকাশে তুলোর মতো কিউমুলাস, কখনও পাতলা সিরাস, আবার কখনও বৃষ্টি–ঝড়ের নিম্বোস্ট্রাটাস দেখা যায়। মেঘ শুধু একটি আবহাওয়া–নির্দেশক নয়, বরং পৃথিবীর জলচক্র ও পরিবেশব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ—যা আকাশকে প্রতিদিন ভিন্ন রূপে সাজিয়ে দেয়।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *