মেঘনাদবধ কাব্য


📘 মেঘনাদবধ কাব্য

লেখক: মাইকেল মধুসূদন দত্ত
ধরন: মহাকাব্য
ছন্দ: অমিত্রাক্ষর
প্রকাশ: ১৮৬১ (দুই খণ্ডে)


১. পরিচিতি

  • বাংলা সাহিত্যের সর্বশ্রেষ্ঠ মহাকাব্য।
  • মাইকেল মধুসূদন দত্তের দ্বিতীয় কাব্য।
  • রচিত হয়েছে অমিত্রাক্ষর ছন্দে
  • মোট ৯টি সর্গ
  • রামায়ণ অবলম্বনে রচিত হলেও মূল ভাবনায় রয়েছে পশ্চিমা মহাকাব্যের প্রভাব (মিল্টনের Paradise Lost)।

২. রচনাকাল ও প্রকাশ

  • ১৮৬১ সালে দুই খণ্ডে প্রকাশ।
  • খণ্ড–১ (সর্গ ১–৫) : জানুয়ারি ১৮৬১
  • খণ্ড–২ (সর্গ ৬–৯) : ১৮৬১ সালের প্রথমার্ধ
  • ব্যয়ভার বহন করেন দিগম্বর মিত্র; কাব্যটি তাঁকেই উৎসর্গ।

📚 ৩. সর্গভিত্তিক সারাংশ


🔶 প্রথম সর্গ — অভিষেক

  • রাবণের পুত্র বীরবাহুর মৃত্যুসংবাদে শোক।
  • চিত্রাঙ্গদার বিলাপ; পুত্রহত্যার জন্য রাবণকে দোষারোপ।
  • মেঘনাদের আমোদপ্রমোদ ত্যাগ করে যুদ্ধগমন।
  • রাবণ গঙ্গাজল দ্বারা মেঘনাদকে সেনাপতিরূপে অভিষেক করেন।

🔶 দ্বিতীয় সর্গ — অস্ত্রলাভ

  • লঙ্কার রাজলক্ষ্মী দেবতাদের কাছে রামের বিপদের কথা জানান।
  • ইন্দ্র দুর্গা ও শিবের সাহায্য চান।
  • দেবী মায়া ইন্দ্রকে বিশেষ অস্ত্র প্রদান করেন—যেগুলি মেঘনাদের মৃত্যুর কারণ হবে।
  • অস্ত্র রামের কাছে পৌঁছে যায়।

🔶 তৃতীয় সর্গ — সমাগম

  • প্রমীলা যুদ্ধভয় অগ্রাহ্য করে লঙ্কাগমনের সংকল্প।
  • হনুমানের বাধা অতিক্রম করে রামের অনুমতিতে লঙ্কায় প্রবেশ।
  • প্রমীলা ও মেঘনাদের মিলন।
  • দুর্গা জানান—যুদ্ধের আগে তিনি প্রমীলার তেজ হরণ করবেন।

🔶 চতুর্থ সর্গ — অশোকবন

  • সীতা ও সরমার কথোপকথন।
  • সীতার দুঃখব্যথা, রাবণের প্রতি ঘৃণা।
  • মারীচের প্রতারণা ও সীতাহরণের স্মরণ।
  • সীতা স্বপ্নে কুম্ভকর্ণের মৃত্যু দেখেছিলেন।

🔶 পঞ্চম সর্গ — উদ্যোগ

  • সুমিত্রার স্বপ্নাদেশে লক্ষ্মণের যুদ্ধগমন।
  • রাম ও বিভীষণের অনুমতি।
  • মায়াদেবী লক্ষ্মণকে উপায় বলেন—নিকুম্ভিলা যজ্ঞে আকস্মিক হামলা করতে।
  • অন্যদিকে মেঘনাদ যজ্ঞে প্রবৃত্ত।

🔶 ষষ্ঠ সর্গ — বধ

  • বিভীষণ ও লক্ষ্মণের নিকুম্ভিলা যজ্ঞাক্রমণ।
  • মেঘনাদের সঙ্গে যুদ্ধে লক্ষ্মণের বিজয়।
  • মেঘনাদের বধ—কাব্যের কেন্দ্রীয় ঘটনাবিন্দু।
  • রামের গভীর দুঃশ্চিন্তা; কিন্তু দেবী সরস্বতীর আশ্বাসে শান্তি।

🔶 সপ্তম সর্গ — শক্তিনির্ভেদ

  • পুত্রবধের সংবাদে রাবণের জ্ঞানহার।
  • রাবণের প্রতিশোধযাত্রা।
  • দেবতাদের সঙ্গে যুদ্ধ—রাবণ ইন্দ্রকে পরাজিত করে।
  • রাবণের শক্তিশেল দ্বারা লক্ষ্মণ মূর্ছিত হয়ে পতিত।

🔶 অষ্টম সর্গ — প্রেতপুরী

  • লক্ষ্মণের মৃত্যুশোকে রামের বিলাপ।
  • কৈলাশে শিব–পার্বতীর কথোপকথন।
  • রামের প্রেতপুরী দর্শন।
  • লক্ষ্মণের জীবন ফিরে পাওয়া; রামের শিবিরে উৎসব।

🔶 নবম সর্গ — সংস্ক্রিয়া

  • রাবণ সাত দিনের যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করে পুত্রের অন্ত্যেষ্টি সম্পন্ন করেন।
  • প্রমীলা সহমরণের সংকল্পে চিতায় আরোহণ।
  • সীতা গভীর দুঃখ প্রকাশ করেন।
  • সিন্দুনীরে স্নান শেষে শোকার্ত রাক্ষসদলের লঙ্কা প্রত্যাবর্তন।

৪. বিষয়বস্তু ও কাঠামো

  • রামায়ণ অবলম্বনে রচিত হলেও মধুসূদন চরিত্রগুলিকে আধুনিক ব্যাখ্যায় উপস্থাপন করেছেন।
  • রাবণ ও মেঘনাদকে বীররসপূর্ণ নায়কসুলভ অবয়বে দেখানো হয়েছে।
  • পশ্চিমা মহাকাব্য–গঠন: দেব–মানব–যুদ্ধ, দুঃখান্ত পরিসমাপ্তি।
  • কাব্যের নায়ক রাবণ, যা সংস্কৃত মহাকাব্যের প্রচলিত নায়কের ধারণার বিপরীত।

৫. ছন্দ

  • কাব্যটি রচিত অমিত্রাক্ষর ছন্দে (Blank Verse)।
  • ছন্দে নেই অন্ত্যমিল; আছে মাত্রাবিন্যাস, অনুপ্রাস, উচ্চারণগত গতি।
  • বাংলা ছন্দে আধুনিকতার বিপ্লব ঘটায়।

৬. সমালোচনা (সংক্ষেপ)

  • রবীন্দ্রনাথ: মধুসূদনের কাব্যের সামাজিক বিদ্রোহে মুগ্ধ।
  • বিবেকানন্দ: কাব্যের বীরত্ব ও শিল্পরসের প্রশংসা।
  • মধুসূদন নিজে: কাব্যকে “বীররসের মহাগীতি” বলেছেন।
  • আলঙ্কারিক দৃষ্টিতে কাব্যটি পুরোপুরি সংস্কৃত মহাকাব্যের নিয়ম মানে না—
    • নায়ক অনার্য,
    • রস–প্রাধান্যে করুণ রস,
    • সর্গান্তে পূর্বাভাস নেই।
  • তবুও বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে আধুনিক ও শিল্পসুষম মহাকাব্য।

🎯 ৭. সংক্ষিপ্ত উপসংহার

  • বাংলা সাহিত্যের প্রথম আধুনিক মহাকাব্য।
  • নায়ক-নির্বাচন, ভাবধারা, ছন্দ—সবক্ষেত্রেই বিপ্লব।
  • “রামায়ণ” থেকে বেরিয়ে এসে “ইন্দ্রজিৎ–রাবণ”–কেন্দ্রিক মানবিক ট্র্যাজেডি আঁকা—এটাই কাব্যের বিশেষত্ব।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *