মুঘল শাসনামলে বাংলার সামাজিক ও প্রশাসনিক কাঠামো
মুঘল শাসনামল (১৬ শতকের শেষ ভাগ থেকে ১৮ শতকের মাঝামাঝি) বাংলার ইতিহাসে এক গভীর পরিবর্তনের যুগ। আকবরের অভিযানের মাধ্যমে বাংলা যখন মুঘল সাম্রাজ্যের সুবাহ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হলো, তখনই শুরু হয় প্রশাসন, সমাজব্যবস্থা, ভূমি রাজস্বনীতি, আইন, বাণিজ্য ও সংস্কৃতির ব্যাপক রূপান্তর। মুঘল কেন্দ্রীয় শাসনব্যবস্থা বাংলাকে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে এনে দেয়, এবং পরবর্তী দুই শতাব্দী ধরে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, সামাজিক গতিশীলতা ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির ভিত্তি তৈরি করে।
এই প্রবন্ধে মুঘল শাসনামলে বাংলার সামাজিক বৈশিষ্ট্য, প্রশাসনিক কাঠামো, রাজস্ব পদ্ধতি, কর্মকর্তা শ্রেণির ভূমিকা, শহরায়ন, আইন-শৃঙ্খলা ব্যবস্থা ও সামাজিক স্তরবিন্যাস বিশদভাবে আলোচিত হবে।
১. মুঘল বাংলার প্রশাসনিক কাঠামো: সুবাহ থেকে মৌজা
মুঘল শাসনে দক্ষ, কেন্দ্রীয় ও শ্রেণিভিত্তিক প্রশাসন ব্যবস্থা চালু ছিল। আকবরের আমলে তৎকালীন ভারতকে কয়েকটি সুবাহে বিভক্ত করা হয়, যার মধ্যে বাংলা অন্যতম প্রভাবশালী সুবাহ হয়ে ওঠে।
১.১ সুবাহ (Subah)
বাংলা ছিল একটি বিস্তীর্ণ সুবাহ, যার রাজধানী পর্যায়ক্রমে—
- রাজমহল,
- ঢাকা,
- মুর্শিদাবাদ
ঢাকা (১৬০৮–১৭১৭) ছিল সুবাহ বাংলার সবচেয়ে শক্তিশালী প্রশাসনিক ঘাঁটি।
১.২ সরকারের বিভাজন
সুবাহকে কয়েকটি সরকারে ভাগ করা হতো। প্রতিটি সরকারের দায়িত্বে থাকতেন—
- ফৌজদার (সামরিক-প্রশাসনিক প্রধান)
- আমিন (মাপজোক ও রাজস্ব নিরূপণ)
- কোতোয়াল (শৃঙ্খলা রক্ষা)
১.৩ পরগনা ও মৌজা
- পরগনা: রাজস্ব সংগ্রহের জন্য স্থলভাগের মৌলিক একক
- মৌজা: সর্বনিম্ন ইউনিট; এখানে জমিদার, মৌজাদার, তালুকদার বা জোতদারদের সক্রিয় ভূমিকা ছিল
মুঘল প্রশাসন ছিল অত্যন্ত সংগঠিত, ধাপভিত্তিক ও কার্যকর।
২. মুঘল আমলের রাজস্ব কাঠামো ও ভূমি ব্যবস্থাপনা
মুঘলরা ভূমি ও রাজস্ব ব্যবস্থায় যে পরিবর্তন আনেন, তা বাংলার সমাজ-অর্থনীতিকে আমূল বদলে দেয়।
২.১ দাহসালাই পদ্ধতি
আকবরের শাসনামলে প্রবর্তিত দাহসালা পদ্ধতি ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ।
এতে—
- জমির উর্বরতা,
- ফসলের ধরন,
- উৎপাদন ক্ষমতা,
- পূর্ববর্তী দশ বছরের গড় ফলন
—এইসব বিবেচনায় রাজস্ব নির্ধারণ হতো।
২.২ জমিদারি ও ইজারা ব্যবস্থা
যদিও মুঘলরা সরাসরি রাজস্ব সংগ্রহের পক্ষে ছিলেন, বাস্তবে স্থানীয় জমিদারদের হাতে অনেক ক্ষমতা থেকে যায়।
- জমিদার: রাজস্ব সংগ্রাহক
- ইজারাদার: অস্থায়ী কর-সংগ্রাহক
- মৌজাদার/তালুকদার: গ্রামের স্তরে ভূমি তত্ত্বাবধায়ক
২.৩ মাল ও খরাজ
- খরাজ ছিল কৃষিজমির উপর প্রধান কর।
- কৃষক নগদ বা ফসলের অংশ হিসেবে কর দিত।
এই সুবিন্যস্ত রাজস্ব কাঠামো কৃষি, বাণিজ্য ও উৎপাদনকে উৎসাহিত করে।
৩. মুঘল প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা
৩.১ সুবাহদার
- সুবাহের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক ও সামরিক প্রধান
- আইনশৃঙ্খলা, রাজস্ব ও বিচার সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রণে থাকত
বাংলার সুবাহদাররা যেমন ইসলাম খান চিশতি, শায়েস্তা খান—বাংলার ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেন।
৩.২ দীওয়ান
- অর্থ ও রাজস্ব বিভাগের প্রধান
- জমির মাপজোক, কর নির্ধারণ, হিসাবরক্ষণ তত্ত্বাবধান করতেন
৩.৩ কুতওয়াল
- শহরের আইনশৃঙ্খলা, বাজার নিয়ন্ত্রণ, অগ্নিনির্বাপণ ও জনসুরক্ষার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা
৩.৪ ফৌজদার
- স্থানীয় সামরিক শাসক
- বিদ্রোহ দমন, দুর্গ রক্ষণাবেক্ষণ, বহিরাগত আক্রমণ প্রতিরোধ
৩.৫ আমিন
- জমির মাপজোক করে কর নির্ধারণ
৩.৬ মোকাদ্দমা ও প্যাটওয়ারি
- গ্রামীণ প্রশাসনিক স্তরের প্রতিনিধি
- ভূমির নথি সংরক্ষণ, কর সংগ্রহের কাজে যুক্ত ছিলেন
৪. মুঘল আমলে বাংলার সামাজিক কাঠামো
৪.১ বহুস্তরীয় সমাজব্যবস্থা
মুঘল শাসনে বাংলা সমাজে ধর্মীয়, অর্থনৈতিক ও পেশাগত বৈচিত্র্য আরও গভীর হয়।
সমাজে প্রধানত চার শ্রেণি দেখা যায়—
- উচ্চ শ্রেণি: সুবাহদার, ফৌজদার, আমির-উমরাহ
- মধ্যবিত্ত: জমিদার, বণিক, উস্তাদ, কাজী, পণ্ডিত
- কৃষিজীবী জনগোষ্ঠী
- শ্রমজীবী ও কারিগর শ্রেণি
৪.২ কৃষক শ্রেণি: সমাজের মূলভিত্তি
বাংলা ছিল কৃষিনির্ভর সমাজ।
কৃষকরা—
- ধান, পাট, আখ, তুলো, মসলা উৎপাদন করতেন
- খরচ বাদে নির্দিষ্ট রাজস্ব প্রদান করতেন
সেচব্যবস্থা ও নদীপথ উন্নত হওয়ায় খাদ্য উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়।
৪.৩ কারিগর ও বণিক শ্রেণির উত্থান
বাংলার—
- জামদানি
- মসলিন
- রেশম
- স্বর্ণকার
- মৃৎশিল্প
- কাঠের কাজ
- ধাতব কারুশিল্প
বিশ্বখ্যাত ছিল।
মুঘল আমলে বাণিজ্য বৃদ্ধি পাওয়ায় এই শ্রেণির সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি পায়।
৪.৪ ধর্মীয় সহনশীলতা ও সাংস্কৃতিক সমন্বয়
মুঘলরা সাধারণত ধর্মীয় সহিষ্ণতার নীতি অনুসরণ করতেন।
- ইসলাম, হিন্দু, বৌদ্ধ ও লোকধর্ম—সব ধর্মই তুলনামূলক নিরাপদ পরিবেশ পায়।
- সুফি দরবার, খানকা, মসজিদ, মন্দির, পীর-আউলিয়ার প্রভাব সমাজে বিস্তৃত হয়।
- ফার্সি ভাষা প্রশাসনের ভাষা হয়, তবে বাংলা ভাষার সাহিত্যিক বিকাশও চলতে থাকে।
৫. শহরায়ন ও সামাজিক পরিবর্তন
৫.১ ঢাকার নগরায়ন
ঢাকা মুঘল আমলে একটি সুপরিকল্পিত শহরে রূপ নেয়—
- দুর্গ, বাজার, কুঠি, নৌঘাট
- পুলিশ ব্যবস্থা
- রাস্তাঘাট
- প্রশাসনিক ভবন
এগুলো শহরের আধুনিকায়নের ভিত্তি গড়ে দেয়।
৫.২ বাণিজ্যকেন্দ্রিক সামাজিক রূপান্তর
চট্টগ্রাম, মুর্শিদাবাদ, সোনারগাঁ, হুগলি—এই মহল্লাগুলো বাণিজ্যের কেন্দ্র হওয়ায় সেখানে—
- কারিগরদের বসতি
- বাজার সম্প্রসারণ
- বহিরাগত ব্যবসায়ীদের আগমন
- নগরসংস্কৃতি গঠন
এগুলো বাংলার সামাজিক কাঠামোকে বৈচিত্র্যময় করে তোলে।
৬. আইন-শৃঙ্খলা ব্যবস্থা
৬.১ বিচারব্যবস্থা
মুঘলরা দ্বৈত বিচারব্যবস্থা চালু করেন—
- শরিয়তি আদালত: মুসলমানদের জন্য
- ধর্মসংক্রান্ত প্রথাগত আইন: হিন্দুদের অভ্যন্তরীণ মামলায় প্রয়োগ
৬.২ পুলিশব্যবস্থা
- কুতওয়াল পুলিশবাহিনী পরিচালনা করতেন।
- চুরিডাকাতি প্রতিরোধ, বাজারদর নিয়ন্ত্রণ, অগ্নি নিয়ন্ত্রণ ছিল দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত।
মুঘল শাসনামলে বাংলা ছিল সুবিন্যস্ত প্রশাসন, উন্নত ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থা, নিরাপদ বাণিজ্যিক পরিবেশ এবং সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের একটি সফল মডেল। এই যুগে—
- প্রশাসনিক কাঠামো সুসংগঠিত হয়,
- সমাজব্যবস্থায় পেশা ও শ্রেণিভিত্তিক বৈচিত্র্য বিস্তার পায়,
- বাণিজ্য কেন্দ্রিক শহর গড়ে ওঠে,
- আইন-শৃঙ্খলা ও শাসনব্যবস্থা শক্তিশালী হয়,
- কৃষি ও শিল্প উভয়ই সমৃদ্ধ হয়।
এভাবে মুঘল আমল বাংলার সামাজিক স্থিতি, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মূল ভিত্তি স্থাপন করে, যা পরবর্তী সময়ে ঔপনিবেশিক প্রভাব ও আধুনিক রাষ্ট্রগঠনের ভিত্তিমূল হিসেবে কাজ করে।
