বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক পুনরুত্থান (১৯৯০-এর গণঅভ্যুত্থান)
১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক সমৃদ্ধ ও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রে গণতান্ত্রিক শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য জনমত ও জনগণের শক্তির প্রদর্শন। ১৯৮০-এর দশকে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ, সামরিক শাসন ও অর্থনৈতিক-সামাজিক অসন্তুষ্টি দেশের রাজনীতিকে উত্তেজনাপূর্ণ করেছিল। জনমুক্তি, গণতান্ত্রিক অধিকার ও শাসনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে দেশের মানুষ এই আন্দোলনের মাধ্যমে ঐতিহাসিক পরিবর্তন আনে।
১. প্রেক্ষাপট
১৯৭৫ সালের হত্যাকাণ্ডের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবেশ অস্থির হয়ে ওঠে। সেনা অভ্যুত্থান ও সামরিক শাসন স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়।
(ক) জিয়াউর রহমানের যুগ
জিয়াউর রহমান ১৯৭৭ থেকে ১৯৮১ পর্যন্ত রাষ্ট্র পরিচালনা করেন। রাজনৈতিক অস্থিরতা, বিদ্রোহ ও পার্টি রাজনীতি এই সময় দেখা যায়।
(খ) হোসেন মোহাম্মদ এরশাদের শাসন
১৯৮২ সালে সেনা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে হোসেন মোহাম্মদ এরশাদ ক্ষমতা দখল করেন। পার্টি রাজনীতি বন্ধ, গণমাধ্যমে সেন্সরশিপ এবং রাজনৈতিক স্বাধীনতা সীমিত হয়।
(গ) জনসাধারণের অসন্তোষ
- সরকারি অনিয়ম ও দুর্নীতি
- মানবাধিকার লঙ্ঘন
- অর্থনৈতিক ও সামাজিক সমস্যা
২. আন্দোলনের সূচনা
১৯৮০-এর দশকের শেষভাগে শিক্ষার্থী, সাংবাদিক, শ্রমিক এবং সাধারণ জনগণ সরাসরি আন্দোলনে অংশ নেয়। ১৯৮৩ থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত গণতান্ত্রিক আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায় দেখা যায়।
(ক) শিক্ষার্থী আন্দোলন
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরা সরকারবিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্ব দেয়। শহীদ মিনার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আন্দোলনের কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে।
(খ) শ্রমিক ও কৃষক আন্দোলন
শ্রমিক ও কৃষক ক্ষোভ প্রকাশ করে, বেতন, মূল্যস্ফীতি এবং জমি অধিকার সংক্রান্ত দাবিতে আন্দোলন তীব্র হয়।
(গ) রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা
আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাসদ ও অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলো আন্দোলনকে সমর্থন করে এবং দেশব্যাপী বিক্ষোভ ও সমাবেশ আয়োজন করে।
৩. গণঅভ্যুত্থানের ঘটনাপ্রবাহ
১৯৯০ সালের শুরুতে জনঅভ্যুত্থান তীব্র রূপ নেয়।
- জুন-নভেম্বর ১৯৯০: বিভিন্ন শহরে বড় ধরনের বিক্ষোভ ও ধর্মঘট
- ডাক্তার, শিক্ষার্থী ও শ্রমিক অংশগ্রহণ: সামাজিক স্তরের সর্বাত্মক সংযোগ
- সেনা ও পুলিশের প্রতিক্রিয়া: প্রথমদিকে দমন, পরে সরকার দমন সামলাতে ব্যর্থ
(ক) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভুমিকা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আন্দোলনের অন্যতম কেন্দ্র। ছাত্র-নেতারা মূল নেতৃত্ব প্রদান করে।
(খ) গণসংযোগ ও সংবাদ মাধ্যম
সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধিতে সংবাদপত্র ও গণমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
৪. এরশাদের পদত্যাগ
জনমুক্তি আন্দোলনের চাপ বৃদ্ধি পায়। ৬ ডিসেম্বর ১৯৯০ সালে হোসেন মোহাম্মদ এরশাদ পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। এর ফলে দেশ রাজনীতিতে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়।
(ক) সামরিক শাসন থেকে গণতান্ত্রিক শাসনে রূপান্তর
দেশে নির্বাচন ও রাজনৈতিক স্বাধীনতা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়।
- নবগঠিত caretaker government তত্ত্বাবধানে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়
- ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠন করে
৫. গণঅভ্যুত্থানের প্রভাব
(ক) রাজনৈতিক প্রভাব
- সাংবিধানিক গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা
- রাজনৈতিক দলগুলোর স্বাধীনতা বৃদ্ধি
- নির্বাচন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা
(খ) সামাজিক প্রভাব
- জনসাধারণের রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি
- নাগরিক অধিকার ও স্বাধীনতার গুরুত্ব বোঝা
- সমাজে দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে সতর্কতা
(গ) অর্থনৈতিক প্রভাব
- রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বৃদ্ধি, বিদেশি বিনিয়োগে ইতিবাচক প্রভাব
- অর্থনৈতিক নীতি ও সংস্কারে সহায়ক ভূমিকা
৬. সমসাময়িক গুরুত্ব
১৯৯০-এর গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ঐতিহ্যের অংশ। আজও শিক্ষার্থী, সাংবাদিক ও নাগরিক সমাজ এই আন্দোলনকে উদাহরণ হিসেবে গ্রহণ করে। রাজনৈতিক সচেতনতা, নাগরিক অধিকার এবং গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি টিকিয়ে রাখতে এটি গুরুত্বপূর্ণ।
(ক) শিক্ষাগত প্রভাব
বিদ্যালয়, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনের ইতিহাস শেখানো হয়।
(খ) নাগরিক সচেতনতা
আন্দোলনের ইতিহাস নাগরিকদের তাদের অধিকার ও কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন করে।
৭. চ্যালেঞ্জ ও শিক্ষণীয় পাঠ
(ক) চ্যালেঞ্জ
- রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং পার্টি রাজনীতি
- দুর্নীতি ও প্রশাসনিক জটিলতা
- সমাজের অর্থনৈতিক বৈষম্য
(খ) শিক্ষণীয় পাঠ
- জনগণের একতা ও সংকল্পের শক্তি
- গণতন্ত্র রক্ষা করতে সক্রিয় নাগরিক অংশগ্রহণ
- সামাজিক ও রাজনৈতিক সমস্যার সমাধানে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের গুরুত্ব
১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসে গণতান্ত্রিক পুনরুত্থানের গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। জনগণ তাদের অধিকার, গণতন্ত্র ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য ঐক্যবদ্ধ হয়। এরশাদের পদত্যাগ এবং পরবর্তীতে নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠা হলো বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়।
এই আন্দোলন শুধু রাজনৈতিক পরিবর্তন আনে না, বরং জনগণকে সচেতন, একজোট ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলেছে। ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের নাগরিক সমাজ ও গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির চিরন্তন চিহ্ন।
