বঙ্গভঙ্গ (১৯০৫) ও বাঙালি জাতীয়তাবাদের উত্থান
বাংলার ইতিহাসে ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ ছিল এমন একটি ঘটনা, যা শুধু প্রশাসনিক নয়, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকেও ইতিহাসের গতিপথ বদলে দেয়। বঙ্গভঙ্গের মধ্যেই বাঙালি জাতিসত্তা, স্বকীয়তা, ঐক্যবোধ এবং আত্মমর্যাদাবোধ সুস্পষ্টভাবে জাগ্রত হয়। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন বাংলাকে ভাঙতে চেয়েছিল; কিন্তু সেই বিভক্তির প্রচেষ্টাই বাঙালিকে একত্র করেছিল আরও শক্তিশালী জাতীয় ধারণায়। এই প্রবন্ধে বঙ্গভঙ্গের পটভূমি, বাস্তবায়ন, প্রতিক্রিয়া এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদের উত্থান নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
প্রথম অধ্যায়: বঙ্গভঙ্গের পটভূমি
১. ব্রিটিশ ভারতের প্রশাসনিক জটিলতা
উনিশ শতকের শেষভাগে বাংলা ব্রিটিশ ভারতের অন্যতম বৃহৎ প্রদেশ ছিল। বিস্তীর্ণ জনসংখ্যা, দুরূহ প্রশাসন, নানা জাতিগোষ্ঠী ও অর্থনৈতিক বৈষম্য—এই সব কারণে ব্রিটিশ প্রশাসন দাবি করছিল বাংলাকে ‘কার্যকর প্রশাসনের জন্য ভাঙা প্রয়োজন’। কিন্তু এর পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যও ছিল।
২. ‘Divide and Rule’ নীতি
ব্রিটিশ শাসকগোষ্ঠীর প্রধান লক্ষ্য ছিল বাঙালি মুসলিম ও হিন্দু জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করা। কারণ সেই সময় বাংলা ছিল ভারতের জাতীয়তাবাদের প্রধান কেন্দ্র। ব্রিটিশরা জানত—
- বাঙালির রাজনৈতিক চেতনা দ্রুত জাগছে
- সাহিত্য-সংস্কৃতির পুনর্জাগরণ ঘটছে
- উচ্চশিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণি ব্রিটিশবিরোধী চিন্তায় উদ্বুদ্ধ
এ অবস্থায় বঙ্গভঙ্গ ছিল একটি সাংগঠনিক কৌশল।
৩. লর্ড কার্জন ও তাঁর অভিপ্রায়
লর্ড কার্জন বাংলা বিভক্ত করে দুইটি প্রদেশ গঠন করেন:
১. পূর্ববঙ্গ ও আসাম (রাজধানী: ঢাকা)
২. পশ্চিমবঙ্গ (রাজধানী: কলকাতা)
কার্জনের বক্তব্য ছিল “প্রশাসন সহজ করতে চাওয়া”, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এটি ছিল বাঙালির জাতীয় শক্তি দুর্বল করার রাজনৈতিক পরিকল্পনা।
দ্বিতীয় অধ্যায়: বঙ্গভঙ্গের বাস্তবায়ন ও তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া
১. বঙ্গভঙ্গ ঘোষিত হওয়ার পর বাঙালির ক্ষোভ
১৯০৫-এর ১৬ অক্টোবর বঙ্গভঙ্গ কার্যকর হতেই বাংলায় ব্যাপক ক্ষোভ দেখা দেয়। কলকাতা, ঢাকাসহ শহর ও গ্রামে প্রতিবাদের জোয়ার ওঠে।
বিক্ষোভের প্রধান ধরন ছিল:
- হরতাল
- প্রতিবাদ মিছিল
- পত্রিকা ও বক্তৃতার মাধ্যমে সচেতনতা
- জাতীয় শিক্ষা আন্দোলন
- ব্রিটিশ পণ্য বর্জন
এটি ছিল স্বদেশী আন্দোলনের সূচনা।
২. স্বদেশী ও বয়কট আন্দোলন
স্বদেশী আন্দোলন বাঙালির জাতীয় জীবনকে নতুন মাত্রা দেয়। ব্রিটিশ পণ্য বর্জন করে বাঙালিরা স্বদেশী পণ্যের ব্যবহার শুরু করে। জাতীয় মিল, তাঁতশিল্প, কুটিরশিল্পকে উৎসাহ দেওয়া হয়।
স্বদেশী আন্দোলনের মূল বৈশিষ্ট্য:
- ব্রিটিশ পণ্যের প্রকাশ্য দাহ
- স্বদেশী দ্রব্য উৎপাদনে সমবায়
- দেশীয় শিল্পপতিদের পৃষ্ঠপোষকতা
- স্বদেশী বিদ্যা, জাতীয় শিক্ষা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি
এ আন্দোলনের মধ্য দিয়েই বাঙালি জনগণের রাজনৈতিক চেতনা দানা বাঁধে।
৩. রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা
বঙ্গভঙ্গ-পরবর্তী সময়ে কংগ্রেস ও বঙ্গীয় জাতীয় সম্মেলন সক্রিয় ভূমিকা নেয়। তিলক, বিপ্লবী অরবিন্দ ঘোষ, বাঘা যতীন, বীনয়-বাদল-দীনেশ প্রমুখ নেতারা গণচেতনা জাগাতে বিশাল ভূমিকা রাখেন।
তৃতীয় অধ্যায়: সাহিত্য, সংস্কৃতি ও জাতীয় চেতনার প্রসার
১. রবীন্দ্রনাথের ভূমিকা
বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করতে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন নেতৃত্বের কেন্দ্রবিন্দু।
- তিনি গান রচনা করেন: “বাংলার মাটি, বাংলার জল…”
- ১৬ অক্টোবর ‘রাখিবন্ধন’ উৎসবের আয়োজন করেন, যেখানে হিন্দু-মুসলমান মিলিতভাবে বন্ধন রচনা করে ঐক্যে শপথ নেয়
- তাঁর রচনায় বারবার উঠে আসে জাতীয় চেতনাবোধ ও মানবিক ঐক্য
২. পত্র-পত্রিকা ও চিন্তাবিদদের ভূমিকা
আনন্দবাজার, যুগান্তর, বালক, সঞ্জীবনী ও নবজাগরণমূলক পত্র-পত্রিকা মানুষকে আন্দোলনের যুক্তি, লক্ষ্য ও কর্মপদ্ধতির বিষয়ে সচেতন করে।
৩. নাটক, গান ও লোকসংস্কৃতি
বঙ্গভঙ্গের প্রতিরোধ বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিসরে বিপুল সৃজনধারা সৃষ্টি করে। সমবেত সংগীত, দেশাত্মবোধক গান, নাটক, উক্তি, কবিতা—সবই নতুন মনস্তত্ত্ব সৃষ্টি করে।
চতুর্থ অধ্যায়: বাঙালি জাতীয়তাবাদের উত্থান
১. নতুন রাজনৈতিক চেতনার বিকাশ
বঙ্গভঙ্গ বাঙালি মুসলমান ও হিন্দুকে ‘বাঙালি’ পরিচয়ে একত্রিত করে। রাজনৈতিক পরিচয় তখন আর ধর্মভিত্তিক নয়—জাতীয় স্বপ্নভিত্তিক। চেতনার কেন্দ্রস্থলে ছিল:
- স্বশাসনের দাবি
- বিদেশি শোষণের বিরুদ্ধে সংগ্রাম
- জাতিসত্তার স্বকীয় মূল্যবোধ
২. মুসলিম মধ্যবিত্তের জাগরণ
বঙ্গভঙ্গ নিয়ে বিতর্ক থাকলেও, পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশ গঠনে মুসলিম মধ্যবিত্ত শ্রেণির শিক্ষাগত ও প্রশাসনিক সুযোগ বৃদ্ধি পায়। ঢাকায় প্রশাসনিক রাজধানী গঠন মুসলিম উদ্যোক্তা, বুদ্ধিজীবী ও পেশাজীবী শ্রেণিকে নতুন সম্ভাবনা দেয়।
এতে মুসলিম সমাজেও রাজনৈতিক সচেতনতা তৈরি হয় এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদ শক্তিশালী হয়।
৩. স্বদেশী শিল্প-বাণিজ্যের বিকাশ
স্বদেশী আন্দোলনের বিস্তৃত অর্থনৈতিক প্রভাব পড়ে:
- দেশীয় তাঁতশিল্পের পুনর্জাগরণ
- কৃষিজ পণ্য বাজারজাতকরণ
- শিক্ষিত যুবসমাজের স্বনির্ভর উদ্যোগ সৃষ্টি
- সমবায় উৎপাদন কেন্দ্র
এই অর্থনৈতিক স্বাধীনতার ধারণাই পরবর্তী কালে জাতীয় স্বাতন্ত্র্যের কেন্দ্রে পরিণত হয়।
৪. বিপ্লবী আন্দোলনের উত্থান
বঙ্গভঙ্গ-পরবর্তী সময়েই অরবিন্দ ঘোষ, ক্ষুদিরাম বসু, প্রফুল্ল চাকী প্রমুখ বিপ্লবীরা আত্মপ্রকাশ করেন। সশস্ত্র সংগ্রাম ও রাজনৈতিক আন্দোলন দু’ধারায় চলতে থাকে।
পঞ্চম অধ্যায়: বঙ্গভঙ্গের প্রত্যাহার (১৯১১)
জনসাধারণের ব্যাপক আন্দোলন, গণ-চাপ, আন্তর্জাতিক সমালোচনা এবং ব্রিটিশ প্রশাসনের রাজনৈতিক সংকটের কারণে ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ বাতিল করা হয়। কিন্তু:
- বঙ্গভঙ্গ সাময়িকভাবে বাতিল হলেও
- বাঙালি জাতিসত্তা, আত্মপরিচয় ও জাতীয় রাজনৈতিক চেতনা স্থায়ী ভিত্তি পায়
১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ প্রত্যাহার ছিল মানুষের বিজয়, কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ ছিল বাঙালির জাতীয় জাগরণের অবিস্মরণীয় উত্থান।
ষষ্ঠ অধ্যায়: বঙ্গভঙ্গের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব
১. জাতীয় রাজনীতিতে বাংলার নেতৃত্ব
বঙ্গভঙ্গ-পরবর্তী সময় থেকেই বাংলা ভারতের জাতীয় রাজনীতির নেতৃত্ব দিতে থাকে। নেতाजी সুভাষ বসু থেকে কাজী নজরুল ইসলাম—সমস্ত চিন্তাবিদই জাতীয় মুক্তিসংগ্রামে যুক্ত হন।
২. স্বাধীনতার ভিত রচনা
স্বদেশী আন্দোলন, শিক্ষায় জাতীয়তাবাদ, দেশের পণ্যের প্রতি ভালোবাসা—এসব মিলেই ১৯৪৭ সালের স্বাধীনতার ভিত গড়ে তোলে।
৩. বাঙালি পরিচয়ের সাংস্কৃতিক দৃঢ়তা
বঙ্গভঙ্গ বাঙালি ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে এমন একটি প্ল্যাটফর্ম দেয়, যা ভবিষ্যতে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন ও ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের মানসিক প্রস্তুতি তৈরি করে।
বঙ্গভঙ্গ (১৯০৫) ছিল বাঙালিকে ভাঙার প্রচেষ্টা। কিন্তু ইতিহাসের আশ্চর্য ব্যঙ্গ—এই বিভক্তিই বাঙালিকে করে আরও ঐক্যবদ্ধ, আরও সুসংগঠিত ও আরও সচেতন। বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে বাঙালির প্রতিবাদেই জন্ম নেয় আধুনিক বাঙালি জাতীয়তাবাদ, যা পরবর্তী সব গণ আন্দোলনের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।
বঙ্গভঙ্গ তাই শুধু একটি প্রশাসনিক ঘটনা নয়—এটি বাঙালির আত্মসচেতনতা, আত্মমর্যাদা ও স্বাধীনতার চেতনার সূচনা-পর্ব।
