প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় ইতিহাস: প্রাচীন বাংলার জনপদ ও সভ্যতার পরিচয়


প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় ইতিহাস: প্রাচীন বাংলার জনপদ ও সভ্যতার পরিচয়

বাংলার ইতিহাস বহুস্তর-সমৃদ্ধ, বহুধা বৈচিত্র্যময় এবং হাজার বছরের রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিবর্তনের ধারক। প্রাচীন বাংলার জনপদ, নগরসভ্যতা ও জনজীবনের ইতিহাস শুধু আমাদের উত্স সন্ধানই নয়—এলাকার সামাজিক চিন্তা, অর্থনীতি, ধর্মবিশ্বাস এবং সাংস্কৃতিক পরিচয়ের গভীর শেকড়ও উন্মোচন করে। ‘বঙ্গ’, ‘সমতট’, ‘পুন্ড্র’, ‘রাঢ়’ ও ‘বারেন্দ্র’—এই অঞ্চলগুলো মিলেই গড়ে ওঠে প্রাচীন বাংলার শক্ত ভিত্তি, যার ওপর প্রতিষ্ঠিত হয় পরবর্তী মধ্যযুগীয় বাংলা, আর সেই বিবর্তনের ধারাই আমাদের আধুনিক জাতিসত্তার ভিত্তি।


প্রাচীন বাংলার ভূগোল ও জনজীবন

প্রাচীন বাংলার স্থানিক প্রকৃতি ছিল নদীসমৃদ্ধ, কাদামাটির উর্বর ভূমি এবং মৌসুমি বৃষ্টিনির্ভর কৃষির আদর্শ পরিবেশ। পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, করতোয়া, আত্রাই, তিস্তা, বুড়িগঙ্গা প্রভৃতি নদী বাংলার জীবনযাত্রার কেন্দ্রবিন্দু ছিল। নিয়মিত প্লাবন জমি উর্বর করত এবং কৃষিজ পণ্যের প্রবৃদ্ধি গ্রামজীবনে স্থিতিশীলতা আনত।

বাংলার মানুষ তখন প্রধানত ধানচাষ, শাকসবজি, পাট, আখ এবং নানাবিধ ফলমূল উৎপাদনে অভ্যস্ত ছিল। জালে ও নৌকায় নির্ভর মাছ ধরা ছিল অর্থনৈতিক ও খাদ্য উৎসের একটি মূল অংশ। বাঁশ, বেত, কাঠ, মাটি ইত্যাদি উপকরণে তৈরি ঘরবাড়ি, সরঞ্জাম ও দৈনন্দিন উপকরণ ছিল লোকশিল্পের প্রাচীন সূচনা। এ অঞ্চলের মানুষ প্রকৃতিনির্ভর জীবনপদ্ধতিতে অভ্যস্ত হওয়ায় তারা ছিল শান্তিপ্রিয়, পরিশ্রমী এবং সমন্বয়ধর্মী।


জনপদ ও প্রাচীন প্রশাসনিক কাঠামো

প্রাচীন বাংলায় ছোট-বড় বহু জনপদ ছিল। উল্লেখযোগ্য জনপদগুলো হলো—

  • পুন্ড্রবর্ধন (বগুড়া-পৌড়িয়া অঞ্চল)
  • সমতট (কুমিল্লা-নোয়াখালী-বিক্রমপুর)
  • রাঢ় (পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম-বারুইপুর অঞ্চল)
  • গৌড় (রাজশাহী ও পার্শ্ববর্তী এলাকা)
  • বরেন্দ্রভূমি (রাজশাহীর উত্তরের অঞ্চল)

এই জনপদগুলো একেকটি ছিল ক্ষুদ্র সামাজিক-রাজনৈতিক ইউনিট, যেখানে নিজস্ব প্রথা, আইন এবং শাসনব্যবস্থা ছিল। বিভিন্ন বর্ণ ও সম্প্রদায়ের মানুষ এই জনপদগুলোতে বসবাস করত। তাদের নিজেদের মুদ্রা, শুল্কনীতি ও কৃষিনির্ভর অর্থনীতি ছিল। নগর-রাজ্যগুলোর সঙ্গে দূরবর্তী বাণিজ্যিক সম্পর্কও গড়ে উঠেছিল, বিশেষ করে তক্ষশিলা, পাটলিপুত্র, কৌশাম্বী ও মগধ অঞ্চলের সঙ্গে।


মহাজনপদের যুগে বাংলা

ষষ্ঠ খ্রিস্টপূর্বাব্দে বারোটি মহাজনপদের মধ্যে বাংলার দুইটি অঞ্চল—অঙ্গবঙ্গ—উল্লেখযোগ্য। বিশেষত ‘অঙ্গ’ ছিল প্রাক্-মগধীয় যুগের একটি শক্তিশালী জনপদ। এই সময় বাংলায় নৌবাণিজ্য প্রসারিত হয়। সমুদ্রপথে শ্রীলঙ্কা, বার্মা, মালয়, জাভা, সুমাত্রা পর্যন্ত বাংলার ব্যবসায়ীদের যোগাযোগের প্রমাণ পাওয়া যায়।

তখন বাংলার কাপড়, বিশেষত মসলিন, নীল, রেশম এবং শণজাত দ্রব্য দূরদেশে খ্যাত ছিল। মসলিনের উৎকর্ষ এতটাই ছিল যে রোমান সেনেট এ নিয়ে আইন জারি করতে বাধ্য হয়েছিল। বন্দরনগরী তাম্রলিপ্তি (বর্তমান তমলুক) ছিল উপমহাদেশের অন্যতম বড় সমুদ্রবন্দর।


মৌর্য ও গুপ্ত যুগে বাংলা

মৌর্য যুগ (খ্রিস্টপূর্ব ৩২২—১৮৫)

সম্রাট অশোকের শাসনামলে বাংলা মগধ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। অশোক তাঁর ধর্মপ্রচার কর্মকাণ্ডে বাংলায় বহু স্থানে বৌদ্ধবিহার প্রতিষ্ঠা করেন। এ সময় বাংলায় কৃষি জমির বিস্তার, সেচব্যবস্থার উন্নয়ন ও প্রশাসনিক কাঠামোর শক্তিশালীকরণ ঘটে।

গুপ্ত যুগ (৪র্থ—৬ষ্ঠ শতক)

গুপ্ত যুগকে উপমহাদেশের স্বর্ণযুগ বলা হয়; বাংলাও এর অংশীদার ছিল। সাহিত্য, শিল্প, ভাস্কর্য, ক্ষেত্রসম্ভার, মুদ্রাব্যবস্থা—সব ক্ষেত্রেই উন্নতি হয়।

সমতট ও পুন্ড্রবর্ধনে গুপ্ত প্রভাব সুস্পষ্ট ছিল। তবে পূর্ব বাংলার ক্ষেত্রে স্থানীয় স্বাধীনতা তুলনামূলক বেশি ছিল। গুপ্ত মুদ্রা, মন্দির স্থাপত্য, মুক্তবৎ ভাস্কর্য বাংলার শিল্প ঐতিহ্যকে দৃঢ় ভিত্তি দেয়।


শশাঙ্ক ও গৌড় সাম্রাজ্যের উত্থান

গৌড়েশ্বর রাজা শশাঙ্ক (৬০৬—৬৩৭ খ্রি) পূর্ব ভারতের ইতিহাসে প্রথম বৃহৎ স্বাধীন বাঙালি সম্রাট। তাঁর রাজধানী ছিল কর্ণসুবর্ণ (বর্তমান মুর্শিদাবাদ)। শশাঙ্ক শক্তিশালী সামরিক কাঠামো গড়ে তোলেন, নৌবাহিনী শক্তিশালী করেন এবং গঙ্গা-যমুনা অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন।

তিনি:

  • নদীপথ বাণিজ্য সুরক্ষিত করেন
  • কৃষি উৎপাদন বাড়ান
  • স্থাপত্য ও শিল্পকলার পৃষ্ঠপোষকতা করেন
  • রাজনৈতিকভাবে উত্তর ভারতকে চ্যালেঞ্জ জানান

শশাঙ্কের মৃত্যু পরবর্তী সময়ে বাংলা একাধিক ক্ষুদ্র রাজ্যে ভাগ হয়ে যায়—গৌড়, রাঢ়, সমতট, হরিকেল ইত্যাদি।


পাল যুগ: বৌদ্ধধর্মের স্বর্ণযুগ

পাল সাম্রাজ্য (৭৫০—১১৬১ খ্রি) ছিল বাংলার ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায়। গোপাল, ধরমপাল, দেবপাল প্রমুখ শাসকরা বাংলা, বিহার, উড়িষ্যা থেকে গঙ্গা-যমুনা উপত্যকা পর্যন্ত বিস্তৃত সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন।

পালদের অবদান—

  • বৌদ্ধধর্মের মহাপ্রসার
  • নালন্দা, বিক্রমশীলা, সোমপুর মহাবিহার—বিশ্বের শ্রেষ্ঠ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান
  • মুদ্রা, শিলালিপি, ভাস্কর্য, টেরাকোটা শিল্প
  • বর্ণনাত্মক স্থাপত্য ও বিশাল দালান নির্মাণের সূচনা
  • আন্তর্জাতিক বৌদ্ধ নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠা

সোমপুর মহাবিহার (পাহাড়পুর) আজও UNESCO বিশ্বঐতিহ্য।


সেন যুগ: হিন্দু ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতির বিস্তার

পালের পর আসে সেন যুগ (১১০০—১২৩০ খ্রি)। বল্লাল সেন, লক্ষ্মণ সেন প্রমুখ শাসকরা ছিলেন শক্তিশালী প্রশাসক ও ব্রাহ্মণ্যধর্মের পৃষ্ঠপোষক।

সেন যুগে—

  • মানুষ কৌলীন্য প্রথা দ্বারা সামাজিকভাবে বিভক্ত হয়
  • কৃষি উৎপাদনে নতুন প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয়
  • নদী-বন্দর বাণিজ্য বিস্তৃত হয়
  • সাহিত্যচর্চা সমৃদ্ধ হয়: গীতগোবিন্দ, সন্ধ্যাকর নন্দীর রচনা

লক্ষ্মণ সেনের দরবারে বিজয় সেন, জয়দেব, ধোই, উমাপতি, গোবর্ধন প্রমুখ কবি ছিলেন।


ধর্ম ও আধ্যাত্মিকতার বিবর্তন

বাংলায় ধর্মীয় বিশ্বাসের ক্রমবিকাশ প্রাকৃতিক দেবতার পূজা থেকে ব্রাহ্মণ্যধর্ম → বৌদ্ধধর্ম → শৈব-স্মার্ত → বৈষ্ণবধর্ম—এভাবে বিভিন্ন স্তর অতিক্রম করে।

  • বৌদ্ধধর্ম: পাল যুগে সর্বোচ্চ উন্নতি
  • হিন্দুধর্ম: সেন যুগে ব্রাহ্মণ্য শক্তির বিস্তার
  • স্থানীয় লোকবিশ্বাস: নদী, বৃক্ষ, শস্য, সর্পপূজা

এই সমন্বয়ধর্মিতা বাংলার আধ্যাত্মিকতাকে বহুস্বরিক করে তোলে।


প্রাচীন বাংলার সভ্যতার মূল বৈশিষ্ট্য

১. নদীকেন্দ্রিক জীবন
২. কৃষিনির্ভর অর্থনীতি
৩. মৃৎশিল্প ও টেরাকোটা শিল্প
৪. কাপড় ও মসলিন উৎপাদন
৫. নৌবাহিনী ও সমুদ্রবাণিজ্যে দক্ষতা
৬. বৌদ্ধ ও হিন্দু স্থাপত্যশৈলীর সমন্বয়
৭. নানাবর্ণের লোকসংস্কৃতি
৮. বিদেশি বণিকদের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক
৯. জনপদের স্বশাসনব্যবস্থা
১০. ধর্মীয় সহনশীলতা


প্রাচীন বাংলার নগর সভ্যতা

নগরকেন্দ্রিক জনপদের মধ্যে অন্যতম:

  • মহাস্থানগढ़ (পুন্ড্রবর্ধন)
  • বিক্রমপুর (সমতট)
  • তাম্রলিপ্তি
  • কোটিবর্ষ
  • কর্ণসুবর্ণ

এই নগরগুলোতে:

  • দুর্গনির্মাণ
  • বাজার ও বন্দর
  • মুদ্রা লেনদেন
  • টেরাকোটা অলঙ্করণ
  • ইট-নির্মিত নগরদেয়াল

সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিল মহাস্থানগড়, যা বাংলার সবচেয়ে প্রাচীন নগরের প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ।


প্রাচীন বাংলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য

বাংলার সাংস্কৃতিক বিচিত্রতা প্রকাশ পায়—

  • লোকসঙ্গীত
  • নৃত্য
  • উৎসব ও আচার
  • অলঙ্কার নির্মাণ
  • নৌকা সংস্কৃতি
  • কৃষিকেন্দ্রিক আচার

বাংলার লোকধর্ম, মঙ্গলকাব্য, গাথা গান, বৌদ্ধচর্যা—এইসব মিলেই নাগরিক ও গ্রামীণ সংস্কৃতি সমান তালে বিকশিত হয়।


প্রাচীন बंगার জনपদ ও सभ्यতা বাংলা জাতিসত্তার প্রথম ভিত্তি। নদীনির্ভর কৃষি, সমৃদ্ধ নগরসভ্যতা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বৌদ্ধ ও হিন্দু ধর্মীয় চিন্তার বিকাশ, লোকসংস্কৃতির বহুরৈখিক ধারা—এইসব উপাদান মিলেই গড়ে ওঠে এক প্রাণবন্ত সভ্যতা, যার উত্তরাধিকার মধ্যযুগীয় বাংলা ও আধুনিক জাতিচেতনায় গভীরভাবে প্রোথিত। বাংলার প্রাচীন জনপদ শুধু ইতিহাস নয়, তারা আমাদের চিরন্তন পরিচয়ের উৎস।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *