প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় ইতিহাস : বাংলার রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিবর্তন
বাংলার ইতিহাস দীর্ঘ, বৈচিত্র্যময় এবং বহুধাবিভক্ত। প্রাচীন যুগের জনপদ ও নদীনির্ভর সভ্যতা থেকে শুরু করে পাল-সেনদের ধর্মীয় সহিষ্ণু শাসন, মুসলিম শাসনামলের প্রশাসনিক পরিবর্তন, আর ইলিয়াস শাহ ও হোসেন শাহদের স্বাধীন সুলতানি—বাংলার ইতিহাসের প্রতিটি স্তরেই রয়েছে নতুন নির্মাণ, নতুন সংস্কার এবং নতুন চেতনার উন্মেষ। প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় ইতিহাস বাংলার সমাজ, অর্থনীতি, ধর্ম ও সংস্কৃতিকে যে গভীরভাবে আকার দিয়েছে, তার বিশদ বিশ্লেষণই এই প্রবন্ধের উদ্দেশ্য।
প্রাচীন বাংলার জনপদ ও সভ্যতার পরিচয়
বাংলার প্রাচীন ইতিহাস ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত আদি গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র নদ ব্যবস্থার সঙ্গে। নদের খেয়া, জোয়ার-ভাটা আর উর্বর সমতলভূমি মিলেই গড়ে ওঠে প্রাচীন কৃষিভিত্তিক সমাজ। খ্রিস্টপূর্ব প্রথম সহস্রাব্দেই বাংলায় গড়ে ওঠে পুন্ড্র, রাঢ়, বঙ্গ এবং সমতট নামক জনপদ। এই জনপদগুলো সামান্য উপজাতীয় গ্রামবাসী থেকে ধীরে ধীরে সংগঠিত রাজ্যব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হয়।
প্রাচীন বাংলার অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল উন্নত কৃষিকাজ। লাঙল, কাস্তে, ধানচাষ ও পশুশ্রম—এসবের সমন্বয়েই গড়ে ওঠে একটি স্থায়ী অর্থনৈতিক ভিত্তি। নদীবন্দরকে কেন্দ্র করে বাণিজ্য ও জলপথে নৌ-সংস্কৃতি এ জনপদগুলোর জীবনকে গতিশীল করে তোলে।
এ সময়ে ধর্মজীবনও বৈচিত্র্যময় ছিল। ব্রাহ্মণ্য ধর্ম, লোকবিশ্বাস, অ্যানিমিজম ও পরবর্তীতে বৌদ্ধধর্ম মিলে চলত বহু রকমের আচার-অনুষ্ঠান। বাংলার প্রাচীন জনপদগুলোকে তাই এক ধরনের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ক্রসরোড বলা হয়।
পাল ও সেন যুগের বাংলা : শিক্ষা, সংস্কৃতি ও ধর্ম
বাংলার স্বর্ণযুগ হিসেবে পাল ও সেন যুগের নাম স্মরণীয়। অষ্টম থেকে দ্বাদশ শতাব্দী পর্যন্ত এই শাসকেরা বাংলার রাজনৈতিক ঐক্য স্থাপন করে এবং শিক্ষা-সংস্কৃতি ও ধর্মচর্চায় এক নতুন দিগন্ত খোলেন।
পাল যুগ
বৌদ্ধধর্ম, বিশেষত মহাযান ও বজ্রযান, পালদের শাসনব্যবস্থায় বিশেষ গুরুত্ব পায়। ধর্মপাল ও দেবপাল কেবল শাসন নয়, শিক্ষা ও সংস্কৃতিরও অন্যতম পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। তাদের সময়ে গড়ে ওঠে নালন্দা, বিক্রমশীলা, সোমপুর মাহাবিহার, যা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে খ্যাতি অর্জন করে। এখানে শুধু ধর্মীয় শিক্ষা নয়, দর্শন, গণিত, চিকিৎসা ও যুক্তিবিদ্যারও চর্চা হতো।
সেন যুগ
সেনদের আগমনে ধর্মীয় পরিবেশে কিছু পরিবর্তন আসে। ব্রাহ্মণ্যধর্মের প্রভাব বৃদ্ধি পায়, গড়ে ওঠে বহু মন্দির, তীর্থস্থান ও শাস্ত্রচর্চার কেন্দ্র। বল্লাল সেন ও লক্ষ্মণ সেন সাহিত্য, পুঁথি রচনা ও সংস্কৃত ভাষার চর্চায় বিশেষ ভূমিকা রাখেন। লক্ষ্মণ সেনের দরবারে বরণীয় কবি—বিদ্যাপতি, জয়দেব ও বাল্মীকি—বাংলা ও সংস্কৃত উভয় ভাষার সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেন।
ধর্মীয় সহিষ্ণুতা থাকা সত্ত্বেও এই দুই যুগে বাংলার সাংস্কৃতিক পরিচয়ে বৌদ্ধ, হিন্দু, লোকবিশ্বাসসহ বহু ধারার সমন্বয় ঘটে।
বৌদ্ধ ও হিন্দু ধর্মীয় স্থাপত্যের ইতিহাস
বৌদ্ধ ও হিন্দু স্থাপত্য বাংলার মাটি ও সংস্কৃতির একটি অমূল্য সম্পদ। বৌদ্ধ স্থাপত্যে বিশিষ্ট ছিল বিহার, স্তূপ ও চৈত্য। সোমপুর মহাবিহার-এর বিশালতা ও কারুকার্য এ সময়ের স্থাপত্যশৈলীর শ্রেষ্ঠ নিদর্শন। পোড়ামাটির ফলক ও খোদাই করা অলঙ্করণে দেখা যায় মানবজীবন, প্রাণী ও প্রকৃতির অসাধারণ ফুটিয়ে তোলা।
অন্যদিকে হিন্দু স্থাপত্যে গড়ে ওঠে নাগর, দ্রাবিড় ও বঙ্গীয় রীতির মন্দির। ত্রিভুজাকৃতি ছাদ, খিলান, সূক্ষ্ম কারুকার্য এবং পোড়ামাটির নকশা ছিল বিশেষ বৈশিষ্ট্য। দিনাজপুর কান্দিরপাড়া মন্দির, বিক্রমপুরের বিভিন্ন শৈবমন্দির এই যুগের স্বাক্ষর বহন করে।
এই স্থাপত্যগুলো শুধু ধর্মীয় কেন্দ্র ছিল না; এগুলো ছিল বাংলার শিল্প-শৈলীর ধারক ও বাহক।
মুসলিম শাসনামলে বাংলার প্রশাসন ও সমাজ
বারোশো শতকের শেষ থেকে বাংলায় মুসলিম শাসনের সূচনা হয়। লখনোতি বা গৌড় কেন্দ্র করে দিল্লি সুলতানদের অধীনে শাসনব্যবস্থা গড়ে ওঠে। কিন্তু শীঘ্রই স্থানীয় শাসকরা স্বতন্ত্রতার দাবি জানাতে শুরু করেন।
প্রশাসনব্যবস্থা
মুসলিম শাসনামলে বাংলার প্রশাসন ছিল মূলত ইকতা বা অঞ্চলে ভাগ করে দেওয়ার ভিত্তিতে। শাসন পরিচালিত হতো জমি রাজস্ব, কৃষি কর, বিচারব্যবস্থা ও সামরিক ব্যবস্থার সমন্বয়ে। কুতুবুদ্দিন আইবক থেকে ইলিয়াস শাহ পর্যন্ত বিভিন্ন শাসকেরা নদী পথের উপর নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে বন্দর ও বাণিজ্যকে গুরুত্ব দেন।
সমাজ
মুসলিম আগমনের ফলে বাংলার সমাজে বৈচিত্র্য বৃদ্ধি পায়। চাষাবাদ, তাঁতশিল্প, বণিকশ্রেণি, সওদাগর থেকে শুরু করে কৃষিজ শ্রমিক—সব মিলিয়ে এক উন্মুক্ত অর্থনীতির বিকাশ ঘটতে থাকে। গ্রামীণ সমাজেও মুসলিম প্রভাব বিস্তার করে, এবং সুফি-দরবেশদের মাধ্যমে ইসলাম শান্তিপূর্ণভাবে ছড়িয়ে পড়ে।
ইলিয়াস শাহ ও হোসেন শাহ যুগের স্বাধীন সুলতানি শাসন
মধ্যযুগীয় বাংলার ইতিহাসে ইলিয়াস শাহ ও হোসেন শাহ যুগ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। এ সময়েই বাংলার ভূখণ্ড রাজনৈতিকভাবে একত্রিত হয় এবং স্বাধীনতা লাভ করে।
ইলিয়াস শাহ যুগ (১৩৩৮–১৩৮৯)
ইলিয়াস শাহ বাংলাকে দিল্লি সুলতানির প্রভাব থেকে মুক্ত করেন। তাঁর শাসনে গৌড় ও রাজধানী পুনর্গঠিত হয়। বাংলার সামরিক শক্তি বৃদ্ধি পায় এবং বাণিজ্য সমৃদ্ধ হয়।
হোসেন শাহ যুগ (১৪৯৪–১৫১৯)
হোসেন শাহের সময় বাংলার শিল্প-সাহিত্য, ধর্মীয় সহিষ্ণুতা ও স্থাপত্যে উন্নতির স্বাক্ষর দেখা যায়। চৈতন্যদেবের ভক্তিমূলক আন্দোলন, হিন্দু-মুসলিম সাংস্কৃতিক মিলন, মসজিদ-মিনার নির্মাণ, বালাখিলিয়া ও বন্দরনির্ভর বাণিজ্যের প্রসার—সব মিলিয়ে এটি বাংলার রেনেসাঁ-সদৃশ একটি যুগ।
