পৃথিবী কি দিয়ে গঠিত?

১. ভূত্বক (Crust): পৃথিবীর সবচেয়ে বাইরের কঠিন স্তর

পৃথিবীর ভূত্বক আমাদের বাসযোগ্য অঞ্চল। এটি খুবই পাতলা—গড়ে ৫ থেকে ৭০ কিলোমিটার পুরু।
ভূত্বক দুই ধরনের:

  • মহাদেশীয় ভূত্বক – পুরু ও ঘন; গ্রানাইটিক শিলায় গঠিত।
  • মহাসাগরীয় ভূত্বক – পাতলা ও ভারী; ব্যাসাল্টিক শিলায় গঠিত।

ভূত্বকে রয়েছে অক্সিজেন, সিলিকন, অ্যালুমিনিয়াম, লোহা, ক্যালসিয়াম, সোডিয়াম, পটাশিয়াম ও ম্যাগনেশিয়াম। পৃথিবীর শিলার ৯০% গঠিত সিলিকেট যৌগে। এখানেই মাটি, পর্বত, নদী ও জীবনের সকল রূপ গড়ে উঠেছে।


২. ম্যান্টল (Mantle): গলিত ও আধা-ঠাসা শিলার বিশাল অঞ্চল

ভূত্বকের নিচেই আছে ম্যান্টল, যা প্রায় ২,৯০০ কিলোমিটার গভীর। এর গঠন প্রধানত ম্যাগনেশিয়াম, লোহা, সিলিকেট ও অ্যালুমিনিয়ামযুক্ত শিলায়।

কেন ম্যান্টল গুরুত্বপূর্ণ?

  • ম্যান্টল আধা-ঠাসা ও তরলসদৃশ হওয়ায় প্লেট টেকটনিকস ঘটায়।
  • এর মধ্যে কনভেকশন প্রবাহ তৈরি হয়, যা মহাদেশকে সরিয়ে দেয় ও ভূমিকম্পের জন্ম দেয়।
  • আগ্নেয়গিরির লাভা মূলত ম্যান্টল থেকেই আসে।

ম্যান্টলের নিচের অংশে তাপমাত্রা ৩০০০°C ছুঁতে পারে, যা পৃথিবীর অভ্যন্তরীণ তাপ বজায় রাখে।


৩. বাইরের কেন্দ্র (Outer Core): গলিত লোহা ও নিকেলের সাগর

ম্যান্টলের নিচে রয়েছে তরল ধাতুর স্তর—বাইরের কেন্দ্র। এটি মূলত গলিত লোহা ও নিকেল দিয়ে তৈরি।
এই স্তরই পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরি করে।

চৌম্বক ক্ষেত্র কেন গুরুত্বপূর্ণ?

  • সূর্যের ক্ষতিকর কণা ও রশ্মি থেকে পৃথিবীকে রক্ষা করে।
  • GPS, যোগাযোগ উপগ্রহ, নাবিক ও প্রাণীদের দিক-নির্ণয়ে সহায়তা করে।

বাইরের কেন্দ্রের তাপমাত্রা প্রায় ৪০০০°C–৫০০০°C।


৪. ভেতরের কেন্দ্র (Inner Core): কঠিন ধাতুর গোলক

পৃথিবীর একেবারে কেন্দ্রে অবস্থিত ভেতরের কেন্দ্রটি কঠিন, মূলত লোহা ও নিকেল দিয়ে গঠিত।
এখানে প্রচণ্ড চাপের কারণে এত উচ্চ তাপমাত্রা থাকা সত্ত্বেও ধাতু কঠিন থাকে।

ভিতরের কেন্দ্রের বৈশিষ্ট্য:

  • ব্যাস প্রায় ১,২২১ কিলোমিটার।
  • তাপমাত্রা প্রায় ৫০০০°C–৬০০০°C—সূর্যের পৃষ্ঠের সমান!
  • এই কেন্দ্রের ঘূর্ণন পৃথিবীর ঘূর্ণনের তুলনায় সামান্য ভিন্ন, যা ভূতত্ত্বে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

৫. বায়ুমণ্ডল (Atmosphere): পৃথিবীর সুরক্ষার আবরণ

পৃথিবী শুধু কঠিন স্তরেই গঠিত নয়—তার চারপাশে রয়েছে গ্যাসের স্তর। বায়ুমণ্ডল পৃথিবীর জীবনের সুরক্ষা-বর্ম।

বায়ুমণ্ডলের প্রধান উপাদান:

  • নাইট্রোজেন — ৭৮%
  • অক্সিজেন — ২১%
  • আর্গন — ০.৯%
  • কার্বন ডাই-অক্সাইড — ০.০৪%
  • বাষ্প — বিভিন্ন মাত্রায়

বায়ুমণ্ডল সূর্যের ক্ষতিকর অতিবেগুনি রশ্মি আটকায়, জলচক্র বজায় রাখে এবং গ্রহের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে।


৬. জলের স্তর (Hydrosphere): নদী-সমুদ্রের বিস্তৃতি

পৃথিবীর পৃষ্ঠের প্রায় ৭১% জলাচ্ছন্ন। সমুদ্র, নদী, হ্রদ, ভূগর্ভস্থ জল—সবই পৃথিবীর হাইড্রোস্ফিয়ার।

জীবনের বিবর্তন প্রথম এই জলের মধ্যেই হয়েছে।

জলের স্তর জীবজগত, পরিবেশ, আবহাওয়া ও জলবায়ুর ভিত্তিমূল।


৭. লিথোস্ফিয়ার, অ্যাস্থেনোস্ফিয়ার ও টেকটনিক প্লেট

ভূত্বক ও উপরের ম্যান্টল মিলিয়ে গঠিত লিথোস্ফিয়ার টুকরো টুকরো প্লেটে বিভক্ত।
এই প্লেটগুলো অ্যাস্থেনোস্ফিয়ারের উপরে ভাসমান অবস্থায় থাকে।

  • প্লেটের সংঘর্ষে পাহাড় সৃষ্টি হয়।
  • সরে গেলে মহাদেশ ভাঙে বা সরে যায়।
  • নিচে ঢুকে গেলে আগ্নেয়গিরি হয়।

এই গতিশীল প্রক্রিয়া পৃথিবীকে ক্রমাগত নতুন আকারে গড়ে তোলে।


৮. পৃথিবীর গঠন কীভাবে জানলাম?

বিজ্ঞানীরা ভূমিকম্পের PS-তরঙ্গ বিশ্লেষণ করে পৃথিবীর ভিতরের স্তরগুলো সম্পর্কে তথ্য পেয়েছেন।
কারণ:

  • S-তরঙ্গ তরল ভেদ করতে পারে না → তাই জানা যায় বাইরের কেন্দ্র তরল।
  • P-তরঙ্গ গতি পরিবর্তন করলে বোঝা যায় স্তরগুলোর ঘনত্ব আলাদা।

এই তথ্যের ভিত্তিতেই পৃথিবীর অভ্যন্তরীণ গঠন বিজ্ঞানীরা নির্ধারণ করেছেন।


পৃথিবী একটি জটিল, বহুস্তরবিশিষ্ট গ্রহ। এর ভূত্বক আমাদের জীবনের ভিত্তি, ম্যান্টল পৃথিবীর শক্তির উৎস, কেন্দ্র চৌম্বক ক্ষেত্র সৃষ্টি করে, বায়ুমণ্ডল ও জলস্তর জীবনের সুরক্ষা ও স্থিতি নিশ্চিত করে। পৃথিবীর প্রতিটি স্তর পরস্পরের সাথে যুক্ত হয়ে একটি গতিশীল ব্যবস্থা তৈরি করেছে—যা কোটি কোটি বছর ধরে পরিবর্তিত হয়ে আজকের বাসযোগ্য গ্রহে রূপ নিয়েছে। পৃথিবীর গঠন বুঝলে আমরা তার সম্পদ, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় আরও সচেতন হতে পারি।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *