পাল ও সেন যুগে বাংলা: সংস্কৃতি, শিক্ষা ও ধর্ম
বাংলার ইতিহাসে পাল ও সেন যুগ অতি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এই দুই রাজবংশ শুধু রাজনৈতিক শাসনই করেনি; বরং বাংলা অঞ্চলের সংস্কৃতি, ধর্ম, শিক্ষা, শিল্পকলা, স্থাপত্য ও সমাজজীবনে গভীর প্রভাব রেখেছে। পাল যুগে বাংলা ছিল বৌদ্ধধর্মের আন্তর্জাতিক কেন্দ্র, আর সেন যুগে বাংলায় ব্রাহ্মণ্যধর্মের পুনর্জাগরণ ঘটে। এই দুই যুগের সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য বাংলার ইতিহাসকে সমৃদ্ধ করেছে এবং মধ্যযুগীয় সভ্যতার ভিত্তি স্থাপন করেছে।
প্রথম অংশ: পাল যুগে বাংলা (৮ম–১২শ শতক)
১. পালে শাসনব্যবস্থার উত্থান ও রাজনৈতিক পটভূমি
পাল রাজবংশের প্রতিষ্ঠা হয় ৭৫০ খ্রিষ্টাব্দে, যখন গোপাল বাংলার অরাজকতা দূর করে নির্বাচিত রাজা হন। এরপর ধর্মপাল ও দেবপালের শাসনে বাংলা একটি শক্তিশালী সাম্রাজ্যে পরিণত হয়—যাকে বলা হয় পাল সাম্রাজ্য। এ সময় বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার বিস্তীর্ণ এলাকা পাল শাসনের অধীনে আসে। পাল রাজারা ছিলেন বৌদ্ধধর্মের পরম পৃষ্ঠপোষক, বিশেষত মহাযান ও বজ্রযান মতবাদের।
২. পাল যুগের ধর্ম: বৌদ্ধধর্মের স্বর্ণযুগ
বাংলায় বৌদ্ধধর্মের সর্বোচ্চ বিকাশ ঘটে পাল রাজাদের সময়ে।
প্রধান বৈশিষ্ট্য—
- ধর্মপাল ও দেবপাল বিশাল বৌদ্ধ বিহার নির্মাণ করেন।
- বজ্রযান ও তন্ত্রযান মতবাদের জোরালো বিকাশ ঘটে।
- বাংলা হয়ে ওঠে এশিয়ার বৌদ্ধ শিক্ষার প্রধান কেন্দ্র।
- চীন, তিব্বত, জাভা, কম্বোডিয়া, সুমাত্রা থেকে পণ্ডিতরা বাংলায় শিক্ষা নিতে আসতেন।
বিশেষত সোমপুর মহাবিহার ছিল বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ বৌদ্ধ বিশ্ববিদ্যালয়সম। বাংলা বৌদ্ধ সংস্কৃতির প্রভাবে তিব্বতীয় বৌদ্ধধর্মে পাল শিল্পশৈলীর প্রভাব সুস্পষ্টভাবে দেখা যায়।
৩. পাল যুগে শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চা
পাল যুগ ছিল বাংলা ইতিহাসের শিক্ষার শ্রেষ্ঠ সময়।
প্রধান মহাবিহারসমূহ—
- সোমপুর মহাবিহার (পাহাড়পুর, নওগাঁ)
- বিক্রমশীলা মহাবিহার
- নালন্দা মহাবিহার
- জগদ্দল মহাবিহার
- ওদন্তপুর বৌদ্ধ বিশ্ববিদ্যালয়
এই প্রতিষ্ঠানগুলোতে পড়ানো হতো—
- দর্শন
- চিকিৎসাশাস্ত্র
- লজিক (যুক্তিবিদ্যা)
- জ্যোতির্বিজ্ঞান
- গণিত
- শিল্পকলা
- ভাস্কর্য
- বৌদ্ধ ধর্মতত্ত্ব
- সংস্কৃত ব্যাকরণ
চীন ও তিব্বতির বিখ্যাত ভিক্ষু ও ভ্রমণকারীরা পালদের বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে বিশদ বিবরণ দিয়েছেন।
৪. পাল যুগের সংস্কৃতি ও শিল্পকলা
পাল শিল্পশৈলী ছিল অত্যন্ত পরিশীলিত, যা ভারতীয় ভাস্কর্যকলার এক স্বতন্ত্র ধারা তৈরি করে।
পাল শিল্পের বৈশিষ্ট্য
- কালো পাথরের মসৃণ প্রতিমা
- বৌদ্ধ দেবদেবীর সূক্ষ্ম ভাস্কর্য
- উৎকৃষ্ট টেরাকোটা কাজ
- ধাতব প্রতিমা—বিশেষত পিতল ও ব্রোঞ্জ
- লাল ইটের স্থাপত্য
সোমপুর মহাবিহারের স্থাপত্যে দেখা যায় বর্গাকার পরিকল্পনা, সুন্দর ইটের কারুকাজ, স্তূপ ও ভিক্ষুকদের কক্ষ—যা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মন্দির স্থাপত্যে গভীর প্রভাব রাখে।
৫. পাল যুগে সমাজ ও অর্থনীতি
পাল যুগে বাংলার সমাজ ছিল কৃষিনির্ভর।
- ধান, আখ, তিল, ফলমূল উৎপাদন ছিল প্রধান।
- নদীপথে বাণিজ্য অত্যন্ত সমৃদ্ধ ছিল।
- বস্ত্রশিল্প—বিশেষত তুলা ও রেশম—বিশ্ববিখ্যাত হয়ে ওঠে।
- পশুপালন ও মৎস্যশিকার ছিল সাধারণ মানুষের জীবিকার অংশ।
সমাজে বৌদ্ধ, ব্রাহ্মণ্য ও লোকধারার সহাবস্থান ছিল অনন্য।
দ্বিতীয় অংশ: সেন যুগে বাংলা (১১শ–১৩শ শতক)
১. সেন রাজবংশের আবির্ভাব
পাল শক্তি দুর্বল হয়ে পড়লে সেন রাজবংশ আবির্ভূত হয়। দক্ষিণ ভারতীয় উৎসের বল্লাল সেন, বিজয় সেন ও লক্ষ্মণ সেন ছিলেন প্রধান শাসক। সেন যুগে বাংলা রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী হলেও সাংস্কৃতিকভাবে নতুন মোড় নেয়।
২. সেন যুগের ধর্ম: ব্রাহ্মণ্যধর্মের পুনর্জাগরণ
সেন যুগে ব্রাহ্মণ্যধর্ম পুনরায় শক্তিশালী হয়ে বাংলায় প্রতিষ্ঠা লাভ করে।
ধর্মীয় বৈশিষ্ট্য—
- স্মার্ত ব্রাহ্মণ্য ধর্ম পালন
- বেদ, পুরাণ ও স্মৃতি সাহিত্য বিকাশ
- নরমেন্দ্র-শৈব, শাক্ত ও বৈষ্ণব ধারার উত্থান
- জাতিভেদ প্রথা আরও কঠোর হয়
- দত্ত, সেন, পাল বংশের মধ্যে সামাজিক শ্রেণিবিন্যাস সুস্পষ্ট হয়
বল্লাল সেন রচনা করেন দয়াভাগ, যা হিন্দু উত্তরাধিকার আইনের ভিত্তি হয়ে পরে।
৩. সেন যুগের সাহিত্য ও ভাষা
সেন যুগে বাংলা ভাষার প্রাথমিক রূপ ক্রমে বিকশিত হতে থাকে। এসময়ে সংস্কৃত সাহিত্য ও লৌকিক সাহিত্যের মেলবন্ধন দেখা যায়।
উল্লেখযোগ্য অবদান—
- জয়দেবের গীতগোবিন্দ — বৈষ্ণব সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ রচনা
- সন্ধ্যাকর নন্দী— ‘রামচরিত’
- হেমচন্দ্র সেন, গুণাঢ্য, ইত্যাদির কবিতার ধারা
- লোকগাথা, চর্যাপদ থেকে পরবর্তী মঙ্গলকাব্যের বীজ রোপণ
সেন আমলে সংস্কৃত সাহিত্য তুঙ্গে উঠলেও বাংলাভাষার আদি রূপও ধীরে ধীরে সাহিত্যের পথে প্রবেশ করে।
৪. সেন যুগের শিক্ষা
যদিও সেন যুগে পালদের মহাবিহারগুলো অনেকটাই ক্ষয়প্রাপ্ত হয়, তবু শিক্ষা কার্যক্রম থেমে যায়নি।
শিক্ষার বৈশিষ্ট্য—
- ব্রাহ্মণ্য শিক্ষাকেন্দ্র গড়ে ওঠে
- বেদ, ব্যাকরণ, দর্শন, ন্যায়শাস্ত্র পড়ানো হতো
- মঠ ও আশ্রমভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল
- বৈষ্ণব ও শাক্ত ধর্মতত্ত্ব চর্চা বৃদ্ধি পায়
লক্ষ্মণ সেনের রাজসভায় বহু পণ্ডিত, কবি, লেখক ও ভাষাচার্য উপস্থিত থাকতেন।
৫. সেন যুগের সংস্কৃতি, স্থাপত্য ও শিল্পকলা
সেন আমলে মন্দির স্থাপত্য বিশেষ উন্নতি লাভ করে।
স্থাপত্যের বৈশিষ্ট্য—
- পোড়া ইট, টেরাকোটা ফলক
- প্রচুর মন্দির, বিশেষত শিব মন্দির
- নবরত্ন ও একচালা মন্দিরের প্রাথমিক ধারা
- ভাস্কর্যে বৈষ্ণব প্রতিমা, শিবলিঙ্গ, শক্তির প্রতীক
কবিতা, সংগীত, নাট্যকলা ও নৃত্যশিল্পেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা যায়।
পাল ও সেন যুগের তুলনামূলক বিশ্লেষণ
| বিষয় | পাল যুগ | সেন যুগ |
|---|---|---|
| ধর্ম | বৌদ্ধধর্মের উত্থান | ব্রাহ্মণ্যধর্মের পুনরুজ্জীবন |
| শিক্ষা | মহাবিহার ও বৌদ্ধ শিক্ষাকেন্দ্র | সংস্কৃত-ভিত্তিক ব্রাহ্মণ্য শিক্ষা |
| শিল্প | বৌদ্ধ ভাস্কর্য, সোমপুর মহাবিহার | মন্দির স্থাপত্য, শৈব-শাক্ত শিল্প |
| সমাজ | তুলনামূলক উদার, বৈচিত্র্যময় | কঠোর জাতিভেদ, পুরাণমুখী |
| সাহিত্য | বৌদ্ধ দার্শনিক সাহিত্য | গীতগোবিন্দ, সংস্কৃত কাব্য |
পাল ও সেন যুগ বাংলা ইতিহাসের দুটি মৌলিক অধ্যায়। পালদের সময় বাংলা ছিল বৌদ্ধ শিক্ষার আন্তর্জাতিক কেন্দ্র—নালন্দা, বিক্রমশীলা ও সোমপুর মহাবিহার তার প্রমাণ। অন্যদিকে সেন যুগে ব্রাহ্মণ্যধর্ম ও সংস্কৃত সাহিত্যের চূড়ান্ত বিকাশ ঘটে; সৃষ্টি হয় গীতগোবিন্দের মতো অমর সাহিত্যকীর্তি।
এই দুই যুগ মিলেই বাংলার মধ্যযুগীয় সংস্কৃতি, ধর্ম, শিক্ষা ও সমাজকাঠামোর ভিত্তি স্থাপন করে। বৌদ্ধ লোকআধ্যাত্মিকতা, ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতি, লোকবিশ্বাস—সব মিলিয়ে বাংলা হয়ে ওঠে বহুত্ববাদী, শিল্পসাহিত্যমুখী ও মানবিক সভ্যতার উজ্জ্বল কেন্দ্র।
