প্রবন্ধের মূলভাব
হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর “তৈল” প্রবন্ধটি বাঙালি সমাজের নৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকে বুদ্ধিদীপ্ত ব্যঙ্গাত্মক শৈলীতে চিত্রিত করে। প্রবন্ধে “তৈল”কে শুধু পদার্থ বা ভোজ্য জিনিস হিসেবে দেখানো হয়নি; বরং এটি এক রূপক হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে মানুষের সম্পর্ক, ক্ষমতা, প্রভাব, প্রমোশন এবং সামাজিক কৌশল বোঝাতে।
প্রবন্ধের মূল ভাবগুলোকে সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:
- তৈল = ক্ষমতা ও প্রভাবের মাধ্যম:
তৈল দেওয়া বা গ্রহণ করা বাঙালীর সামাজিক ও নৈতিক আচরণের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। হরপ্রসাদ দেখিয়েছেন, যে ব্যক্তি তৈল দিতে জানে, সে সর্বশক্তিমান, কারণ তা দিয়ে সহজেই সম্পর্ক, চাকরি, প্রমোশন বা কোন কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব। - তৈল ও কৌশল:
শুধু তৈল দেওয়া যথেষ্ট নয়; উপযুক্ত সময়, পাত্র এবং কৌশল মিলিত হলে তার সঠিক ফলাফল আসে। তাই সমাজে চলমান প্রায় সকল কার্যক্রমে কৌশল এবং সময়োপযোগী তৈলদান অপরিহার্য। - ব্যক্তি ও সামাজিক জীবনে তৈলের প্রভাব:
প্রবন্ধে দেখা যায়, বাঙালীর দৈনন্দিন জীবনে তৈল ব্যবহারের ধরন, সামাজিক সম্পর্ক, প্রশাসন এবং শিক্ষা—all ক্ষেত্রেই এই “স্নেহ বা তৈল” অপরিহার্য। তৈল না থাকলে বিদ্যা, ধন, বুদ্ধি সবকিছুই কার্যকর হয় না। - ব্যঙ্গাত্মক সমাজচিত্র:
হরপ্রসাদ এখানে সমাজের অসংগতি, স্বার্থপরতা ও প্রমোশনের কৌশলগুলোকে হাস্যরসাত্মক ব্যঙ্গের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, যে সমাজে নিয়ম-কানুন, শিক্ষা এবং নৈতিকতা থাকলেও এগুলো কার্যকর হয় তৈলের মাধ্যমে। - শিক্ষা ও প্রশিক্ষণে তৈলের গুরুত্ব:
প্রবন্ধে বাঙালি শিক্ষার প্রেক্ষাপট তুলে ধরা হয়েছে। শিক্ষার মান, শিক্ষকের প্রভাব, শিক্ষার্থী ও প্রশাসনের সম্পর্ক—সব ক্ষেত্রেই সঠিক তৈলদান ও কৌশলের প্রয়োজনীয়তা প্রমাণিত হয়েছে।
সারসংক্ষেপে:
হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর “তৈল” প্রবন্ধটি আমাদের শেখায় যে, মানব সম্পর্ক, সামাজিক প্রভাব, শিক্ষা ও প্রমোশন—সবকিছুর মূল ভিত্তি হলো কৌশলগত ‘তৈল’ বা প্রভাবশালী স্নেহ। প্রবন্ধটি শুধু বিদ্যাজ্ঞান নয়, বরং সামাজিক কৌশল এবং বাস্তবতার ব্যঙ্গাত্মক প্রতিফলন। এটি প্রায়শই আমাদের সামাজিক ও প্রশাসনিক বাস্তবতার এক আয়নারূপ।
