ছায়াপথ কী?
রাতের আকাশে আমরা লক্ষ করি অসংখ্য নক্ষত্রের ঝিলিক। এই নক্ষত্র, গ্যাস, ধূলিকণা, অন্ধকার পদার্থ এবং নক্ষত্রগুচ্ছের বিশাল সমষ্টিকে বলা হয় ছায়াপথ বা Galaxy। ছায়াপথ হলো মহাবিশ্বের মৌলিক গঠন-ইকাই; অর্থাৎ মহাবিশ্ব ঠিক যেন কোটি কোটি ছায়াপথের একটি বিশাল জাল। প্রতিটি ছায়াপথ নিজস্ব মহাকর্ষীয় শক্তিতে বাঁধা থাকে, যা তাদের ভেতরের সব বস্তু—নক্ষত্র থেকে শুরু করে ব্ল্যাক হোল পর্যন্ত—এক জায়গায় ধরে রাখে।
ছায়াপথের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো এর সংগঠিত কাঠামো। বেশিরভাগ ছায়াপথেই কেন্দ্রে থাকে একটি অতিভারী ব্ল্যাক হোল, যাকে সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাক হোল বলা হয়। এই কেন্দ্রকে ঘিরেই বিলিয়ন বিলিয়ন নক্ষত্র ঘূর্ণায়মান পথে আবর্তিত হয়। ছায়াপথগুলো সাধারণত তিন ধরনের হয়ে থাকে—স্ফাইরাল, উপবৃত্তাকার এবং অনিয়মিত।
- স্ফাইরাল ছায়াপথ: মিল্কি ওয়ে বা আকাশগঙ্গা এই শ্রেণির; এগুলোর বাহুগুলো কুণ্ডলী পাকানো থাকে।
- উপবৃত্তাকার ছায়াপথ: দেখতে ডিম্বাকৃতি, সাধারণত পুরোনো নক্ষত্রে ভরা।
- অনিয়মিত ছায়াপথ: যেগুলোর নির্দিষ্ট আকার নেই, যেমন ম্যাজেলানিক ক্লাউডস।
আমাদের নিজের ছায়াপথের নাম আকাশগঙ্গা বা Milky Way। এটি একটি স্ফাইরাল ছায়াপথ, যার ব্যাস প্রায় ১ লাখ আলোকবর্ষ। এতে আছে প্রায় ১০০–৪০০ বিলিয়ন নক্ষত্র। আমাদের সূর্যও এর একটি সাধারণ নক্ষত্র মাত্র। সূর্য আকাশগঙ্গার বাহুর এক প্রান্তে অবস্থান করে এবং কেন্দ্রকে প্রদক্ষিণ করতে প্রায় ২৩ কোটি বছর সময় নেয়।
ছায়াপথ শুধু নক্ষত্রের সমষ্টি নয়; এগুলো নতুন নক্ষত্রের জন্মস্থানও। গ্যাস-ধুলোর মেঘ সংকুচিত হয়ে যখন তারকা জন্ম দেয়, তখন ছায়াপথ আরও সমৃদ্ধ হয়। আবার পুরোনো তারকা বিস্ফোরিত হয়ে নতুন উপাদান তৈরিও করে। এইভাবে ছায়াপথ হয় এক জীবন্ত মহাজাগতিক কারখানা।
মহাবিশ্বে অনুমান করা হয় দুই ট্রিলিয়নেরও বেশি ছায়াপথ আছে। আর এই অসংখ্য ছায়াপথ আবার গুচ্ছ বা ক্লাস্টার তৈরি করে, যেগুলো সুপারক্লাস্টার নামক বিশাল কাঠামোতে যুক্ত। এর ফলে মহাবিশ্বের বৃহৎ অংশজুড়ে একটি জালের মতো নকশা তৈরি হয়।
ছায়াপথ তাই শুধু মহাবিশ্বের ভরাট উপাদান নয়; এটি মহাবিশ্বের গঠন, বিবর্তন এবং ভবিষ্যৎ বোঝার মূল চাবিকাঠি। আমরা কোথা থেকে এসেছি, আমাদের সূর্য কোথায় অবস্থিত, পৃথিবী কীভাবে গঠিত হয়েছে—সব প্রশ্নের উত্তরই লুকিয়ে আছে ছায়াপথের রহস্যময় গহিনে।
