জীবনে সফলতা কোনো একদিনে আসে না—এর জন্য লাগে দীর্ঘমেয়াদি চেষ্টা, অধ্যবসায়, ধৈর্য এবং নিজের ওপর অগাধ বিশ্বাস। আর এ কথাটির সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো আরিফুল ইসলাম—এক নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে, যার স্বপ্ন ছিল নিজের জীবন বদলে দেওয়া এবং পরিবারের মুখে হাসি ফোটানো।
আরিফুলের জন্ম এক প্রত্যন্ত গ্রামে। বাবা ছিলেন দিনমজুর, মা অন্যের বাড়িতে কাজ করতেন। সংসারে অভাব ছিল প্রতিদিনের অতিথি। তবুও আরিফুল কখনো হতাশ হয়নি। ছোটবেলা থেকেই সে পড়াশোনায় মনোযোগী ছিল। শিক্ষকরা তাকে সবসময় উৎসাহ দিতেন। কিন্তু বাস্তবতা ছিল কঠিন—পেটের দায়ে অনেকসময় তাকে বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থাকতে হতো।
শিক্ষাজীবনের প্রথম বড় বাঁধা আসে অষ্টম শ্রেণিতে। বাবার অসুস্থতার কারণে সংসারের আয় বন্ধ হয়ে গেলে তাকে পড়াশোনা বাদ দিয়ে একটি দোকানে কাজ নিতে হয়। কিন্তু আরিফুল স্বপ্ন ছাড়েনি। দিনের বেলায় কাজ এবং রাতে মোমবাতির আলোয় পড়াশোনা—এভাবেই সে জীবন চালিয়ে যেতে থাকে। তার দৃঢ়তা দেখে দোকান মালিকও বিস্মিত হতেন।
অবশেষে, জেদ আর পরিশ্রমের ফলে আরিফুল দারুণ ফল নিয়ে জেএসসি পাস করে। এরপর SSC-এর সময় আবারও বিপত্তি। টাকার অভাবে ফরমের টাকা জোটেনা। সমাধান আসে তার প্রিয় শিক্ষকের কাছ থেকে। শিক্ষক নিজের পকেট থেকে টাকা দিয়ে তাকে ফরম পূরণ করতে সাহায্য করেন। আরিফুল প্রতিজ্ঞা করে—একদিন সফল হয়ে তিনি এই উপকারের প্রতিদান দেবেন।
SSC-তে সে জিপিএ–৫ পেল। গোটা গ্রামে আনন্দ। সবাই বলল—এই ছেলে একদিন বড় হবে। কিন্তু সামনে আরও কঠিন পথ। কলেজে ভর্তি হওয়ার টাকা নেই। এবার গ্রামের মানুষদের সাহায্যে ভর্তি হলো। কলেজে ভর্তি হলেও আরিফুলকে টিউশনি করে নিজের খরচ চালাতে হতো। দিনে কলেজ, সন্ধ্যায় টিউশনি আর গভীর রাতে পড়াশোনা—এভাবেই কাটে তার কলেজ জীবন।
HSC শেষে আরিফুলের স্বপ্ন—বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া। কিন্তু ভর্তি কোচিংয়ের টাকাই ছিল না। তাই সে ইউটিউব দেখে, বই ধার করে নিজের মতো প্রস্তুতি নেয়। পরীক্ষা দিল এবং বিস্ময়করভাবে দেশের নাম করা একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেল। কিন্তু ভর্তি ফি? আবারও সমস্যা। এবার আরিফুল দৃঢ় সিদ্ধান্ত নেয়—নিজের সামর্থ্যের মধ্যে সব করবে। সে একটি ছোট চাকরি ধরে, কয়েক মাস কঠোর পরিশ্রম করে ভর্তি ফি জোগাড় করল।
বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে নতুন জীবন। চারদিকে প্রতিযোগিতা, বড় শহরের ব্যস্ততা, আর আরিফুলের কাঁধে ছিল অসংখ্য দায়িত্ব। পড়াশোনার পাশাপাশি পার্টটাইম কাজ শুরু করল। সময় বাঁচাতে তাকে প্রতিদিন ৩–৪ ঘণ্টা ঘুমাতে হতো। তবু সে হার মানেনি। নিজের দক্ষতা বাড়াতে বিভিন্ন অনলাইন কোর্স করল। ধীরে ধীরে সে ডিজিটাল মার্কেটিং, গ্রাফিক্স ডিজাইন এবং ওয়েব ডেভেলপমেন্টে দক্ষ হয়ে ওঠে।
চূড়ান্ত সুযোগ আসে তৃতীয় বর্ষে। এক আন্তর্জাতিক ফ্রিল্যান্সিং প্ল্যাটফর্মে সে প্রথম কাজ পায়। প্রথম আয়—মাত্র ২৫ ডলার। কিন্তু আরিফুলের কাছে এটি ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সাফল্য। এরপর শুরু হয় তার ধারাবাহিক উত্থান। কাজের মান দেখে বিদেশি ক্লায়েন্টরা তাকে নিয়মিত কাজ দিতে থাকে। মাত্র দুই বছরের মাথায় সে পরিবারের আর্থিক অবস্থার আমূল পরিবর্তন করে।
বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করার সময় তার মাসিক আয় দাঁড়ায় লক্ষাধিক টাকায়। নিজের পরিবারকে নতুন বাড়ি করে দেয়। বাবার চিকিৎসা করায়, মাকে আর কাজ করতে দেয় না। গ্রামের দরিদ্র শিশুদের জন্য একটি “ফ্রি শেখার কেন্দ্র” প্রতিষ্ঠা করে। যারা টাকার অভাবে পড়াশোনা বাদ দিতে বসেছিল, তাদের পাশে দাঁড়ায় সে নিজেই।
এত কিছু অর্জনের পরও আরিফুল কখনো অহংকারী হয়নি। সে সবসময় বলত—“যেদিন আমার পথ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, সেদিন আমার বিশ্বাস আমাকে নতুন পথ দেখিয়েছে।”
বর্তমানে সে দেশের অন্যতম সফল তরুণ উদ্যোক্তা। নিজের একটি কোম্পানি খুলেছে, যেখানে বহু তরুণ-তরুণী কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছে। তার জীবনের মূলমন্ত্র—
“সাফল্য কাঁধে তুলে দেওয়া হয় না; সাফল্য অর্জন করতে হয় কঠোর পরিশ্রমে।”
আরিফুল আজ হাজারো তরুণের অনুপ্রেরণা। তার গল্প শেখায়—
অভাব সাফল্যের পথে বাধা নয়; ইচ্ছা, চেষ্টা এবং বিশ্বাস থাকলে অসম্ভব বলে কিছু নেই।
দারিদ্র্য নয়, মানসিকতা পরিবর্তন করলেই জীবন বদলে যায়।
ব্যর্থতা নয়, অধ্যবসায়ই মানুষকে সাফল্যের চূড়ায় উঠায়।
এই গল্প কেবল একজন আরিফুলের নয়—এটি প্রতিটি মানুষের গল্প যারা সংগ্রাম করে, স্বপ্ন দেখে এবং একদিন সাফল্যের আলোয় নিজের জীবন আলোকিত করে।
