ঔপনিবেশিক ও আধুনিক ইতিহাস : বাংলার সমাজ, অর্থনীতি ও জাতীয়চেতনার বিবর্তন
ঔপনিবেশিক শাসন বাংলার রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক গঠনে সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদি এবং গভীর প্রভাব ফেলেছে। ইংরেজ শাসনের আগমন থেকে শুরু করে বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী আন্দোলন, কৃষক-জনতার বিদ্রোহ, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধের কূটনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং স্বাধীন বাংলাদেশে সামরিক শাসন—এই পুরো সময়কে বাংলার আধুনিক ইতিহাসের রূপান্তরপর্ব বলা যায়। এই যুগেই গড়ে ওঠে আধুনিক রাষ্ট্রচেতনা, নাগরিকসত্তা এবং জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের ভিত্তি।
ইংরেজ শাসনামলে বাংলার কৃষি, বাণিজ্য ও শিল্প
১৭৫৭ সালের প্লাসির যুদ্ধ শুধু একটি সামরিক ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; এটি বাংলার অর্থনৈতিক স্বাধীনতার ওপর আঘাত হানে। ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে বাংলার ঐতিহ্যবাহী কৃষি ও শিল্প কাঠামোতে ব্যাপক পরিবর্তন আনে।
কৃষি ব্যবস্থা
ইংরেজ শাসনের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন ছিল ১৭৯৩ সালের স্থায়ী বন্দোবস্ত বা Permanent Settlement। এর ফলে জমিদার শ্রেণির সৃষ্টি ও কৃষকের ওপর করের বোঝা বৃদ্ধি পায়। কৃষকেরা জমির মালিকানাবোধ হারিয়ে কেবল খাজনাদাতা হয়ে পড়ে। ফসলের ওপর নানান রকম লেগে রাখা কর-ব্যবস্থা কৃষকের জীবনকে চরম দুরবস্থার দিকে ঠেলে দেয়।
শিল্প ও বাণিজ্য
বাংলার মসলিন, তাঁত, নীলচাষ, ধানচাষ—সবকিছুই শোষণমূলক বাণিজ্যনীতির মুখে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
- মসলিনশিল্প ধ্বংস করা হয় ইংরেজি প্রস্তুত বস্ত্রের বাজার নিশ্চিত করতে।
- নীলকরদের অত্যাচার, বিশেষত ১৮৫৯–৬০ সালের নীলবিদ্রোহ, ছিল চাষিদের ওপর উপনিবেশিক শোষণের জ্বলন্ত উদাহরণ।
- বাংলার অভ্যন্তরীণ বাজারকে বাধ্যতামূলকভাবে ইংরেজি পণ্যের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়।
পরিবহন ও যোগাযোগ
রেলপথ, টেলিগ্রাফ ও নদী-বন্দরের উন্নয়ন করা হলেও এর মূল লক্ষ্য ছিল কোম্পানির বাণিজ্য ত্বরান্বিত করা। কৃষিজ পণ্যের রপ্তানি বাড়লেও শিল্পের বৈচিত্র্য কমতে থাকে।
এই পরিবর্তনগুলো বাংলার অর্থনীতিকে কৃষিনির্ভর, দরিদ্র এবং সুযোগহীন করে তোলে; এবং মানুষের মাঝে ক্ষোভ ও প্রতিরোধের বীজ বপন করে।
১৯০৫-এর বঙ্গভঙ্গ ও বাঙালি জাতীয়তাবাদের উত্থান
১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ আধুনিক বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তি স্থাপন করে। ব্রিটিশরা পানিসম্পদ ও প্রশাসনিক সুবিধার অজুহাতে বঙ্গকে দুটি ভাগে—পূর্ব বাংলা ও পশ্চিম বাংলা—ভাগ করে। কিন্তু এর পেছনে ছিল “Divide and Rule” নীতি।
বাঙালির প্রতিক্রিয়া
বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে তুমুল আন্দোলন শুরু হয়—
- স্বদেশী আন্দোলন,
- বয়কট আন্দোলন,
- দেশি শিল্পকে সমর্থন,
- দেশপ্রেমমূলক সাহিত্যচর্চা,
- নারী সমাজের সক্রিয় অংশগ্রহণ,
- রাজনৈতিক সংগঠন ও ছাত্রসমাজের উত্থান।
রবীন্দ্রনাথের “বাঁধো বাঁধো ভাই” গান, লোকালয়ে রক্ষাবন্ধন অনুষ্ঠান, দেশী পণ্যের ব্যবহার—সব মিলিয়ে বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন সাংস্কৃতিক গণজাগরণের রূপ নেয়।
বঙ্গভঙ্গ রদ
তীব্র প্রতিবাদ ও আত্মত্যাগের ফলে ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ হয়। এটি বাঙালির রাজনৈতিক ঐক্য ও জাতীয়সত্তার প্রথম সুসংগঠিত প্রকাশ।
১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান ও বাঙালি জাতীয়তাবাদের রূপান্তর
১৯৬৯ সাল ছিল পূর্ববাংলার ইতিহাসে এক বিস্ফোরক রাজনৈতিক মুহূর্ত। আইয়ুব খানের দীর্ঘ সামরিক শাসন, বৈষম্যমূলক অর্থনীতি এবং ৬ দফা আন্দোলনের পটভূমিতে পূর্ববাংলার মানুষ ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে।
ছাত্রসমাজের নেতৃত্ব
গণঅভ্যুত্থানের প্রধান চালিকা শক্তি ছিল ছাত্রসমাজ। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ১১ দফা দাবি উত্থাপন করে, যার লক্ষ্য ছিল—
- আইয়ুববিরোধী আন্দোলন,
- সামরিক শাসনের অবসান,
- অর্থনৈতিক বৈষম্যের সংশোধন,
- গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠা।
আসাদ, মতিউর, রুস্তম, আলতাফ আলী—এদের আত্মত্যাগ আন্দোলনকে আরও বেগবান করে।
জাতীয়তাবাদের রূপান্তর
১৯৬৯-এর অভ্যুত্থানের মাধ্যমে জাতীয়তাবাদ শুধু সাংস্কৃতিক পরিচয়ে সীমাবদ্ধ থাকেনি; এটি পরিণত হয়—
- রাজনৈতিক অধিকার,
- অর্থনৈতিক ন্যায্যতা,
- আত্মনিয়ন্ত্রণের দাবি।
পরবর্তীতে ১৯৭০-এর নির্বাচন, ৭ মার্চের ভাষণ এবং অবশেষে ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ—সব কিছুর ভিত্তি স্থাপিত হয় ১৯৬৯-এর গণজাগরণে।
মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট ও কূটনৈতিক ইতিহাস
মুক্তিযুদ্ধ শুধুমাত্র সামরিক বা রাজনৈতিক সংগ্রাম ছিল না; এটি ছিল কূটনৈতিক বিজয়ের এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি
১৯৭১ সালে বিশ্ব ছিল ঠান্ডা যুদ্ধের উত্তাপে বিভক্ত—
- যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের মিত্র,
- সোভিয়েত ইউনিয়ন ভারতের মিত্র,
- চীন পাকিস্তানকে সমর্থন দিচ্ছিল।
এই জটিল পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের পক্ষে আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায় ছিল অত্যন্ত কঠিন।
ভারতের ভূমিকা
ভারত প্রথম থেকেই মানবিক ও রাজনৈতিক সহায়তা দেয়—
- লক্ষাধিক শরণার্থীকে আশ্রয়,
- মুক্তিবাহিনীকে প্রশিক্ষণ,
- মিত্রবাহিনীর সম্মিলিত অভিযান।
বিশ্বমত গঠন
বাংলাদেশের পক্ষে জনমত তৈরি করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন—
- তাজউদ্দীন আহমদ,
- সৈয়দ নজরুল ইসলাম,
- ড. কামাল হোসেন,
- আন্তর্জাতিক সাংবাদিক ও কূটনীতিকরা।
মুক্তিযুদ্ধের কূটনীতি নৃশংস পাকিস্তানি হামলা, গণহত্যা, শরণার্থী সংকট এবং মানবাধিকারের লঙ্ঘনের বিষয়গুলো বিশ্বদরবারে তুলে ধরে।
স্বাধীনতা
১৬ ডিসেম্বর, ১৯৭১—নয় মাসের যুদ্ধ ও কূটনৈতিক সংগ্রামের পর বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করে।
স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সামরিক শাসন
স্বাধীনতার পরপরই বাংলাদেশকে পুনর্গঠন করতে হয় রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে। কিন্তু নানা কারণে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জন কঠিন হয়ে পড়ে।
১৯৭৫-এর পরিস্থিতি
১৫ আগস্ট ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর দেশ রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলার দিকে গড়িয়ে যায়। সামরিক ও আধাসামরিক বাহিনীর ক্ষমতা দখলের ফলে একটি দীর্ঘ অস্থিরতার যুগ শুরু হয়।
সামরিক শাসন
এরপর দেশে সামরিক শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়—
- জিয়াউর রহমানের শাসন (১৯৭৫–১৯৮১)
- হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের শাসন (১৯৮২–১৯৯০)
এই সময়গুলোতে—
- রাজনৈতিক দলীয় কর্মকাণ্ড সীমিত,
- সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে ক্ষমতা কেন্দ্রীকরণ,
- মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ,
- গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সংকুচিত—
এসব পরিস্থিতি তৈরি হয়।
তবে একই সঙ্গে কিছু প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক সংস্কারও দেখা যায়। গ্রামীণ উন্নয়ন ও নির্বাচনব্যবস্থায় পরিবর্তন আসে।
গণআন্দোলন ও গণতন্ত্রের প্রত্যাবর্তন
১৯৯০ সালের গণআন্দোলনের মাধ্যমে এরশাদের পতন ঘটে এবং দেশে গণতান্ত্রিক নির্বাচনব্যবস্থা পুনঃস্থাপিত হয়। এভাবে শুরু হয় আধুনিক বাংলাদেশের রাজনৈতিক যাত্রা।
ঔপনিবেশিক যুগ থেকে আধুনিক বাংলাদেশ পর্যন্ত এই ইতিহাস ধারাবাহিক সংগ্রাম, প্রতিরোধ, আত্মত্যাগ ও নতুন চেতনার নির্মাণের গল্প। ইংরেজ শাসনের অর্থনৈতিক শোষণ, বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধের কূটনীতি এবং স্বাধীনতার পর রাজনৈতিক অস্থিরতা—সব মিলিয়ে গড়ে ওঠে বাংলাদেশের আধুনিক রাষ্ট্রপরিচয়।
এই দীর্ঘ ইতিহাস আমাদের শেখায়—জাতির জাগরণ কখনও হঠাৎ আসে না; এটি আসে সময়, ত্যাগ, সচেতনতা ও সংগ্রামের ধারাবাহিকতার মাধ্যমে।
