ঔপনিবেশিক ও আধুনিক ইতিহাস : বাংলার কৃষি, বাণিজ্য, শিল্প, জাতীয়তাবাদ ও স্বাধীনতা সংগ্রাম
বাংলার ইতিহাসে ঔপনিবেশিক যুগ এক গভীর বেদনাময় অধ্যায়। আঠারো শতকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন প্রতিষ্ঠা থেকে শুরু করে পাকিস্তানি ঔপনিবেশিকতা হয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম—এই দীর্ঘ সময়কালে বাংলা বহু রাজনৈতিক আন্দোলন, অর্থনৈতিক সংকট, সামাজিক রূপান্তর এবং সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে। এই প্রবন্ধে ঔপনিবেশিক ও আধুনিক বাংলার কৃষি, বাণিজ্য, শিল্প, জাতীয়তাবাদী আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনোত্তর রাজনৈতিক পরিস্থিতির পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণ উপস্থাপন করা হলো।
১. ইংরেজ শাসনামলে বাংলার কৃষি, বাণিজ্য ও শিল্প
১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধের মাধ্যমে বাংলার স্বাধীন সুলতানি ও নবাবি শাসনের অবসান হয়। ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করার সাথে সাথেই বাংলার অর্থনৈতিক কাঠামোতে মৌলিক পরিবর্তন আনে।
১.১ স্থায়ী বন্দোবস্ত ও কৃষির শোষণ
১৭৯৩ সালে লর্ড কর্নওয়ালিস স্থায়ী বন্দোবস্ত প্রবর্তন করেন। এর ফলে—
- জমিদাররা রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব পায়,
- চাষিরা তাদের নিজ জমির মালিকানা হারায়,
- কৃষি উৎপাদন কমতে থাকে,
- ব্যাপক দারিদ্র্য ও দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়।
ইংরেজ শাসনে বারংবার ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ হয়—যেমন
- ১৭৭০ সালের মহাদুর্ভিক্ষ,
- ১৯৪৩ সালের বঙ্গভঙ্গীয় দুর্ভিক্ষ।
১.২ বাণিজ্যিক শোষণ
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাধ্যতামূলকভাবে চাষিদের দিয়ে নীল চাষ করায়—যা “নীলচাষ” নামে কুখ্যাত। এ কারণে চাষিরা জমি হারায়, দেনার ফাঁদে পড়ে এবং ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হয়। এর বিরুদ্ধে ১৮৫৯ সালে নীল বিদ্রোহ সংঘটিত হয়।
বাংলার ঐতিহ্যবাহী মসলিন, রেশম, সুতা, বয়নশিল্প ধ্বংস হয় ইচ্ছাকৃত নীতির কারণে। ইংরেজরা ভারতের বাজারকে নিজেদের শিল্পপণ্যের জন্য উপযুক্ত করে তোলে, স্থানীয় শিল্পকারখানা ধ্বংস হওয়ার ফলে ব্যাপক বেকারত্ব সৃষ্টি হয়।
১.৩ রেল, বন্দর ও নগরায়ণ
ইংরেজরা নিজেদের স্বার্থে চালু করে—
- রেলপথ
- বন্দর উন্নয়ন (কলকাতা বন্দরের সম্প্রসারণ)
- ডাকঘর
- টেলিগ্রাম
যদিও এসব অবকাঠামো শোষণের হাতিয়ার ছিল, তবুও আধুনিক প্রশাসন ও যোগাযোগব্যবস্থার ভিত্তি তৈরি হয়।
২. ১৯০৫-এর বঙ্গভঙ্গ ও বাঙালি জাতীয়তাবাদের উত্থান
১৯০৫ সালে লর্ড কার্জন বাংলাকে দুই ভাগে ভাগ করেন—
- পূর্ব বাংলা ও আসাম
- পশ্চিম বাংলা
ব্রিটিশরা এটিকে প্রশাসনিক সংস্কার বললেও প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিল বাঙালিকে বিভক্ত করে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে দুর্বল করা।
২.১ বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন
বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন গড়ে ওঠে—
- রাবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রাখিবন্ধন আন্দোলন
- বয়কট আন্দোলন
- স্বদেশি শিল্প ও শিক্ষার প্রসার
- বঙ্গীয় মুসলিম সমাজের অংশগ্রহণ
এই সময় বাঙালি মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যে রাজনৈতিক চেতনা বৃদ্ধি পায়। স্বদেশি আন্দোলনের মাধ্যমে বাংলা প্রথমবারের মতো ব্রিটিশবিরোধী সর্বজাতীয় জাগরণের অভিজ্ঞতা লাভ করে।
২.২ বঙ্গভঙ্গ প্রত্যাহার
১৯১১ সালে বাঙালির তীব্র আন্দোলনের মুখে ব্রিটিশ সরকার বঙ্গভঙ্গ প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়। এটি বাঙালি স্বাধিকার আন্দোলনের প্রথম প্রকৃত বিজয়।
৩. ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান ও বাঙালি জাতীয়তাবাদের রূপান্তর
পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর পূর্ববঙ্গ পশ্চিম পাকিস্তানের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের শিকার হয়।
- ক্ষুদ্র শাসকগোষ্ঠীর আধিপত্য,
- সাংস্কৃতিক দমননীতি,
- ভাষা সংগ্রাম,
- বঞ্চনা,
সব মিলিয়ে বাঙালির জাতীয় চেতনা নতুন রূপ পায়।
৩.১ ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন
বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দিতে গিয়ে বাঙালিদের রক্ত দিতে হয়—
- সালাম, রফিক, বরকত, জব্বার শহীদ হন।
এই আন্দোলন বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তি স্থাপন করে।
৩.২ আগরতলা মামলা ও ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান
৬ দফা আন্দোলনের পর আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে ‘রাজদ্রোহ’ মামলা (আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা) দায়ের করা হয়।
১৯৬৯ সালে ছাত্র, শ্রমিক ও কৃষকদের বিশাল গণঅভ্যুত্থান পাকিস্তানি সামরিক সরকারের ভিত্তি কাঁপিয়ে দেয়।
- আইয়ুব খানের পতন
- শেখ মুজিবের নিঃশর্ত মুক্তি
- ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি লাভ
এসব ঘটনার মধ্য দিয়ে বাঙালির জাতীয়তাবাদ প্রকাশ পায় স্বাধীনতার স্পষ্ট দাবিতে।
৪. মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট ও কূটনৈতিক ইতিহাস
১৯৭০ সালের নির্বাচনে শেখ মুজিবুর রহমানের আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও ইয়াহিয়া খান ও ভুট্টোর রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের কারণে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হয়নি।
এতে দেশে অসন্তোষ চরমে ওঠে।
৪.১ ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ
শেখ মুজিবুর রহমান বলেন—
“এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।”
এই ভাষণ বাঙালি জাতিকে স্বাধীনতার পথে এগিয়ে দেয়।
৪.২ অপারেশন সার্চলাইট
২৫ মার্চ ১৯৭১ রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী নির্মম গণহত্যা চালায়। ফলে বাঙালিরা সংগঠিত হয়ে সশস্ত্র সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ে।
৪.৩ আন্তর্জাতিক কূটনীতি
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
- ১০ মিলিয়ন শরণার্থীকে আশ্রয়
- সীমান্তে মিত্রবাহিনী প্রশিক্ষণ
- কূটনৈতিক সহায়তা
- ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর যুদ্ধে অংশগ্রহণ
মুক্তিযুদ্ধকে সমর্থন দেয় সোভিয়েত ইউনিয়ন, সাইপ্রাস, যুগোস্লাভিয়া প্রভৃতি।
৫. স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সামরিক শাসন
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীনতা অর্জনের পর বাংলাদেশকে গড়তে হয় ভয়াবহ ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে। রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সামরিক হস্তক্ষেপ এ সময় দেশের অগ্রযাত্রাকে বারবার ব্যাহত করেছে।
৫.১ রাষ্ট্র পুনর্গঠন ও গণতন্ত্র চর্চা
১৯৭২ সালে গণপরিষদের মাধ্যমে সংবিধান রচিত হয়। নতুন রাষ্ট্রকে পুনর্গঠনে—
- কৃষি পুনর্গঠন
- শিল্প পুনর্বিন্যাস
- ব্যাংক জাতীয়করণ
- শিক্ষাব্যবস্থা উন্নয়ন
প্রচেষ্টা নেওয়া হয়।
৫.২ ১৯৭৫ সালের সংকট
১৫ আগস্ট ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হয়।
এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস পরিবর্তন করে দেয়।
৫.৩ সামরিক শাসনের যুগ
১৯৭৫–১৯৯০ পর্যন্ত বাংলাদেশে পর্যায়ক্রমে সামরিক শাসন জারি থাকে—
- খন্দকার মোশতাক
- জিয়াউর রহমান
- এরশাদ
এই সময় গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হলেও—
- গ্রামীণ উন্নয়ন
- বিদেশি কর্মসংস্থান
- শিক্ষা বিস্তার
ইত্যাদি ক্ষেত্রে কিছু উন্নয়ন ঘটে।
৫.৪ গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার
১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে এরশাদের পতন ঘটে এবং বাংলাদেশ আবারও গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরে আসে।
