ইলিয়াস শাহ ও হোসেন শাহ যুগের স্বাধীন সুলতানি শাসন
বাংলার ইতিহাসে স্বাধীন সুলতানি যুগ একটি উজ্জ্বল অধ্যায়। দিল্লি সুলতানির প্রভাবমুক্ত হয়ে বাংলা যখন নিজস্ব সাম্রাজ্য, সংস্কৃতি, প্রশাসন ও রাজনৈতিক পরিচিতি গড়ে তোলে—তখনই প্রকৃত অর্থে বাঙালির স্বাতন্ত্র্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এই পর্বে দু’জন কিংবদন্তি শাসক—ইলিয়াস শাহ ও হোসেন শাহ—বাংলার রাজনীতি, অর্থনীতি, সামরিক শক্তি ও সাংস্কৃতিক বিকাশে অনন্য অবদান রাখেন। তাঁদের শাসনকাল শুধু রাজনৈতিক স্বাধীনতা নয়, ভাষা, সাহিত্য, শিল্প, স্থাপত্য এবং প্রশাসনিক পরিকাঠামোরও ব্যাপক উন্নয়ন ঘটায়। এই প্রবন্ধে ইলিয়াস শাহ ও হোসেন শাহ যুগের স্বাধীন সুলতানি শাসনের বিস্তৃত দিকগুলি বিশ্লেষণ করা হলো।
প্রথম অধ্যায়: ইলিয়াস শাহ – বাংলার স্বাধীনতার প্রতিষ্ঠা
১. ইলিয়াস শাহের রাজনৈতিক আবির্ভাব
চতুর্দশ শতকের ত্রিশের দশক। দিল্লি সুলতানি অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা, তাতার, মোঙ্গল ও আঞ্চলিক বিদ্রোহে দুর্বল। বাংলার নানা অংশ—লখনৌতি, সোনারগাঁ, সতগাঁও—স্বশাসিত বা আধা-স্বাধীন অবস্থায় ছিল। এই বিভক্ত পরিস্থিতিতে আবির্ভূত হন শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ। তিনি প্রমাণ করেন যে একটি সুসংহত, শক্তিশালী ও কেন্দ্রীভূত প্রশাসন ছাড়া বাংলার স্থিতি অসম্ভব।
২. বাংলার একীকরণ: তিন রাজধানীর ঐক্যে নতুন সুলতানি সাম্রাজ্য
ইলিয়াস শাহের সর্বশ্রেষ্ঠ অবদান ছিল তিনটি শক্তিশালী আঞ্চলিক কেন্দ্র—লখনৌতি, সোনারগাঁ ও সতগাঁও—একত্রিত করে একটি সমন্বিত বাংলা সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করা। এর ফলে:
- প্রশাসনের ওপর কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ আসে
- রাজস্ব ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা তৈরি হয়
- সামরিক শক্তি একত্রিত হয়ে শক্তিশালী বাহিনী গঠিত হয়
- বাণিজ্যপথগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়
ইলিয়াস শাহ ছিলেন প্রথম শাসক যিনি “বাংলার সুলতান” নামে পরিচিত হন। এই পরিচয়ের মধ্য দিয়েই ভবিষ্যতের স্বাধীন সুলতানি পরিচয় পরিপূর্ণরূপে প্রতিষ্ঠিত হয়।
৩. সামরিক সাফল্য ও অঞ্চল সম্প্রসারণ
ইলিয়াস শাহ দিল্লি সুলতানির শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টাকে ব্যর্থ করে বাংলার স্বাধীনতা সুদৃঢ় করেন। বিশেষ করে:
- জনাই শাহ ও ফিরোজ শাহ তুঘলকের অভিযান প্রতিহত
- তিরহুত, কামরূপ, কামতা পর্যন্ত অঞ্চল সম্প্রসারণ
- গঙ্গা-পদ্মা ব-দ্বীপের বাণিজ্যপথের নিয়ন্ত্রণ স্থাপন
তাঁর সামরিক সাফল্য বাংলাকে আরব-ফারসি বণিকদের কাছে পুনরায় গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা দেয়।
৪. প্রশাসন ও অর্থনৈতিক সংস্কার
ইলিয়াস শাহ স্থানীয় জমিদার ও আমলাদের নিয়ন্ত্রণে এনে, কর ব্যবস্থা উন্নত করেন। ভূমি কর, কৃষিজ উৎপাদন এবং নদীপথ বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে একটি স্থিতিশীল অর্থনীতি গড়ে ওঠে। টাকশাল প্রতিষ্ঠা ও স্বর্ণ-মুদ্রা প্রচলন বাণিজ্যকে গতিশীল করে।
৫. সাংস্কৃতিক অবদান
ইলিয়াস শাহ বাঙালি মুসলিম রাজসভার সাংস্কৃতিক ভিত্তি তৈরি করেন। ফারসি ভাষা ছিল রাষ্ট্রীয় ভাষা, তবে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির বিকাশও সমান্তরালে চলতে থাকে। তাঁর শাসনামলে স্থাপত্যশৈলীর বিকাশ ঘটে—বিশেষ করে ঢাকার প্রাচীন অঞ্চলে দেখা যায় সুলতানি মসজিদের অলঙ্করণশৈলী।
ইলিয়াস শাহকে তাই বলা হয়—বাংলার স্বাধীন সুলতানি যুগের প্রতিষ্ঠাতা।
দ্বিতীয় অধ্যায়: হোসেন শাহ – বাংলার রেনেসাঁ ও সোনালি যুগ
১. হোসেন শাহের উত্থান
১৫শ শতকের শেষ থেকে ১৬শ শতকের শুরুতে বাংলায় আবির্ভূত হন আলাউদ্দিন হোসেন শাহ। তাঁকে ‘বাংলার আকবর’ বলা হয়। তাঁর শাসনকাল ছিল—
- ন্যায়পরায়ণতা
- ধর্মীয় সহনশীলতা
- সাহিত্য-সাংস্কৃতিক renaissance
- রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা
এর এক অনন্য সমন্বয়।
২. রাজনৈতিক স্থিতি ও শক্তিশালী প্রশাসন
হোসেন শাহ বাংলা প্রশাসনকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যান। তাঁর শাসনব্যবস্থা ছিল কার্যকর, সুবিন্যস্ত ও সুসংগঠিত।
- সীমান্তে স্থায়ী সেনা মোতায়েন
- ন্যায়বিচার ব্যবস্থায় উন্নয়ন
- কর-ব্যবস্থায় সহজীকরণ
- আঞ্চলিক ক্ষমতাকেন্দ্রসমূহকে নিয়ন্ত্রণে এনে কেন্দ্রীয় কর্তৃত্ব শক্তিশালী করা
হোসেন শাহ বাংলাকে একটি স্থিতিশীল রাষ্ট্রে রূপান্তরিত করেন।
৩. অঞ্চল সম্প্রসারণ ও কূটনীতি
হোসেন শাহের সময় বাংলার সীমান্ত ছিল সর্বাধিক প্রশস্ত। তিনি:
- কামরূপ ও কামতা দখলে আনেন
- ত্রিপুরা ও চট্টগ্রাম অঞ্চলে প্রভাব বিস্তার
- আরাকান রাজ্যের সাথে সংঘর্ষে বিজয় অর্জন
- দাক্ষিণাত্যের সুলতান ও দিল্লির লোধি সুলতানির সাথে কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা
এই ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি বাংলাকে আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে।
৪. বাংলা সাহিত্যের স্বর্ণযুগ
হোসেন শাহ মুসলিম শাসকদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সাহিত্য-পৃষ্ঠপোষক ছিলেন।
তাঁর আমলে:
- কবিকাঙ্কণ চণ্ডীদাস, জয়নুল আবেদীন, শ্রীমৎ কাশীরাম দাস, মুকুন্দ রাম—এঁরা মঙ্গলকাব্যের নবযুগ সৃষ্টি করেন
- চৈতন্যদেব বাংলায় ভক্তির আন্দোলন জাগিয়ে তোলেন
- বাংলা ভাষা রাজারশ্রয় লাভ করে
তিনি হিন্দু কবি ও শিল্পীদেরও সমানভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করেন। এ থেকেই তাঁর ধর্মীয় সহনশীলতার প্রমাণ মেলে।
৫. প্রশাসনিক শক্তিশালীকরণ
হোসেন শাহের শাসন ব্যবস্থায় দেখা যায়:
- ফারসি প্রশাসনিক দলিলের পাশাপাশি বাংলায় ব্যবহারের প্রসার
- বিচার ব্যবস্থায় ‘কোতোয়ালি’ প্রথার উন্নয়ন
- রাজস্ব আদায়ে ‘পাইকার’ ও ‘মহাল’ পদ্ধতির সূচনা
- স্থানীয় জমিদার শ্রেণির সঙ্গে ভারসাম্যমূলক সম্পর্ক
এর ফলে কৃষি উৎপাদন ও বাণিজ্যব্যবস্থা আরো আধুনিক ও সুসংগঠিত হয়।
৬. স্থাপত্য ও নগরসভ্যতা
হোসেন শাহের আমলে স্থাপত্যশৈলী নতুন রূপে প্রকাশ পায়:
- টেরাকোটার নকশায় মসজিদ নির্মাণ
- স্থাপত্যে ইট, চুন-সুরকি ও খিলানশৈলীর পরিমার্জন
- গৌড় নগরীর সম্প্রসারণ ও সুরক্ষাবলয়
গৌড় তাঁর সময় বাংলার সর্বাপেক্ষা বৈভবশালী নগরীতে পরিণত হয়।
তৃতীয় অধ্যায়: ইলিয়াস শাহ ও হোসেন শাহ—দুই যুগের তুলনামূলক মূল্যায়ন
১. রাজনৈতিক অবদান
- ইলিয়াস শাহ: স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা ও বাংলা একীভূতকরণ
- হোসেন শাহ: সাম্রাজ্যকে সুসংহত ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্রে পরিণত করা
২. সাংস্কৃতিক ও সাহিত্যিক বিশ্লেষণ
- ইলিয়াস শাহ বাংলা সংস্কৃতির ভিত্তি গড়ে তোলেন
- হোসেন শাহ সেই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে বাংলা সাহিত্যকে স্বর্ণযুগে উন্নীত করেন
৩. প্রশাসনিক দক্ষতা
- ইলিয়াস শাহ প্রশাসনে স্থিতি ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন
- হোসেন শাহ প্রশাসনকে মানবিক, সহনশীল ও উন্নয়নমুখী করে তোলেন
৪. আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক সম্পর্ক
- ইলিয়াস শাহ দিল্লির আধিপত্য থেকে বাংলা মুক্ত করেন
- হোসেন শাহ বাংলা অঞ্চলকে আঞ্চলিক মহাশক্তিতে পরিণত করেন
চতুর্থ অধ্যায়: বাংলার স্বাধীন সুলতানি যুগের মোট মূল্যায়ন
ইলিয়াস শাহ ও হোসেন শাহ যুগ বাংলার রাজনৈতিক স্বাধীনতা, সামাজিক বৈচিত্র্য, ধর্মীয় সহনশীলতা এবং সাংস্কৃতিক সমৃদ্ধিকে এমন উচ্চতায় নিয়ে যায়, যা পরবর্তী সময়ে মুঘল শাসনের গোড়াপত্তনে প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে কৃষি উৎপাদন, নদীবন্দর-নির্ভর বাণিজ্য, আন্তর্জাতিক রুটের ওপর নিয়ন্ত্রণ, স্থাপত্য ও সাহিত্য—এই সব ক্ষেত্রেই সুলতানি বাংলা দক্ষিণ এশিয়ার একটি শক্তিশালী ও স্বনির্ভর রাষ্ট্ররূপে গড়ে ওঠে।
