ইংরেজ শাসনে বাংলার কৃষি, বাণিজ্য ও শিল্পের পতন
(প্রায় ২০০০ শব্দ)
বাংলার ইতিহাসে ইংরেজ শাসন এমন এক অধ্যায়, যেখানে রাজনৈতিক স্বাধীনতার ক্ষয় যেমন ঘটেছে, তেমনি কৃষি, বাণিজ্য ও শিল্পক্ষেত্রে ভয়াবহ পতন ঘটে। ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধের মাধ্যমে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ক্ষমতার যাত্রা শুরু হয় এবং ১৭৯৩ সালে স্থায়ী বন্দোবস্ত প্রবর্তনের মধ্য দিয়ে তারা বাংলার অর্থনীতিকে এমনভাবে পুনর্গঠন করে যে কৃষিজ উৎপাদন, নগরবাণিজ্য, দেশীয় শিল্প এবং কারুশিল্প একের পর এক ধ্বংসের মুখে পড়ে। যে বাংলা একসময় মসলিন, পাট, নীল, সুতি, রেশম ও মসলা উৎপাদনে সমৃদ্ধ ছিল, তা ধীরে ধীরে পরিণত হয় দরিদ্র কৃষিভিত্তিক উপনিবেশে।
এই প্রবন্ধে ইংরেজ শাসনে বাংলার কৃষি, বাণিজ্য ও শিল্প পতনের কারণ, প্রক্রিয়া ও পরিণতি বিশদভাবে আলোচিত হবে।
১. ইংরেজ শাসনের অর্থনৈতিক নীতি: শোষণের ভিত্তি
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রধান লক্ষ্য ছিল মুনাফা বৃদ্ধি। এজন্য তারা বাংলার—
- ভূমি রাজস্ব
- বিদেশি বাণিজ্য
- কাঁচামাল সংগ্রহ
- দেশীয় শিল্প
—এসবের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। অর্থনীতির প্রতিটি স্তরে ইংরেজ শাসন রপ্তানিনির্ভর শোষণের কাঠামো তৈরি করে।
ক) বাংলার কৃষির পতন
২. স্থায়ী বন্দোবস্ত: কৃষি ধ্বংসের প্রথম ধাপ (১৭৯৩)
স্থায়ী বন্দোবস্ত (Permanent Settlement) ছিল বাংলার কৃষকদের জন্য এক মরণফাঁদ।
২.১ জমিদার শ্রেণির উদ্ভব
স্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে—
- জমিদারা রাজস্ব আদায়ের স্থায়ী মালিক হয়
- কৃষক হয়ে পড়ে খাজনা-নির্ভর প্রজা
- কৃষিজমির ওপর তাদের কোনো মালিকানা থাকে না
এই পরিবর্তন গ্রামীণ সমাজে মারাত্মক শোষণ সৃষ্টি করে।
২.২ কৃষকের ওপর নিপীড়ন বৃদ্ধি
জমিদারেরা রাজস্ব সময়মতো জমা না দিলে জমিদারি হারানোর ভয় পেতেন। ফলে তারা—
- কৃষকদের ওপর অতিরিক্ত খাজনা চাপাতেন
- খাজনা না দিলে জমি বাজেয়াপ্ত করতেন
- ঋণ ও মহাজনী প্রথা বাড়িয়ে দিতেন
এর ফলে কৃষকদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে।
২.৩ খাদ্যশস্যের বদলে নগদকরযোগ্য ফসল
ইংরেজরা কৃষিজ উৎপাদনকে নিজেদের শিল্পের কাঁচামালে রূপান্তর করতে চেয়েছিল। তাই—
- খাদ্যশস্য রোপণের বদলে কৃষকদের পাট, নীল, কাপাস ইত্যাদি ফলাতে বাধ্য করা হয়
- ফলে বাংলায় খাদ্যসংকট দেখা দেয়
- কৃষক খাদ্যনির্ভরতা হারায়
৩. নীল চাষ: কৃষি শোষণের নিষ্ঠুরতম রূপ
নীল চাষ বাংলার কৃষকদের জীবনে এমন নৃশংসতা এনেছিল, যার পরিণতি ছিল নীল বিদ্রোহ (১৮৫৯–৬১)।
৩.১ নীলকরদের অত্যাচার
নীলকররা—
- কৃষিকে জোর করে নীল চাষে বাধ্য করত
- অগ্রিম টাকা দিয়ে বাধ্যতামূলক চুক্তি করত
- ফসলের দাম ইচ্ছেমতো নির্ধারণ করত
- কাজ না করলে প্রহার, শারীরিক নির্যাতন করত
৩.২ উর্বর জমির ক্ষতি
নীল চাষে—
- জমি অনুর্বর হয়ে পড়ে
- অন্য ফসল উৎপাদনের ক্ষমতা কমে যায়
- কৃষক দারিদ্র্যের গভীরে ডুবে যায়
৪. দুর্ভিক্ষ: কৃষি পতনের পরিণতি
৪.১ ১৭৭০ সালের দুর্ভিক্ষ
বাংলায় ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ ঘটে ১৭৭০ সালে। ইংরেজ শাসনের অব্যবস্থাপনা, সীমাহীন কর এবং খাদ্য ফসলের ঘাটতি মিলিয়ে এই দুর্ভিক্ষে—
- প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ মারা যায়
- কৃষিজ উৎপাদন ধ্বংস হয়ে যায়
- জনশূন্যতার কারণে বহু মৌজা বন্ধ হয়ে পড়ে
৪.২ পরবর্তী দুর্ভিক্ষসমূহ
১৮৬৬, ১৮৯৭, ১৯৪৩ (মহাদুর্ভিক্ষ) —এসব দুর্ভিক্ষ ইংরেজ শাসনের লোভী নীতিরই ফল।
খ) বাংলার বাণিজ্যের পতন
৫. ইংরেজদের বাণিজ্য একচেটিয়া করার নীতি
পলাশীর যুদ্ধের পর বাংলার সমগ্র বাণিজ্যিক কাঠামো বদলে যায়।
৫.১ কোম্পানির বাণিজ্যিক একচেটিয়াকরণ
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি—
- বাণিজ্যের ওপর লব্ধি (ফরমান) ব্যবহার করে করমুক্ত সুবিধা নেয়
- দেশীয় ব্যবসায়ীদের বাজার থেকে বের করে দেয়
- গুদাম, নদীপথ, নৌবন্দর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনে
৫.২ বাজারে বিদেশি পণ্যের প্রবেশ
ইংল্যান্ডের শিল্প বিপ্লবের পর—
- সস্তা কারখানায় তৈরি কাপড়
- লোহা
- যন্ত্রপাতি
বাংলার বাজারে ঢুকতে শুরু করে। ফলে দেশীয় বণিকরা প্রতিযোগিতায় টিকতে পারেনি।
৫.৩ বাণিজ্যের কেন্দ্র পরিবর্তন
বাংলার—
- সোনারগাঁ
- ঢাকাই বস্ত্র কেন্দ্র
- মুর্শিদাবাদ
- চট্টগ্রাম
এই সমৃদ্ধ বাণিজ্যকেন্দ্রগুলো ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে পড়ে।
গ) বাংলার শিল্পের পতন
৬. দেশীয় শিল্পের ধ্বংস: কোম্পানি শাসনের সবচেয়ে বিপজ্জনক আঘাত
বাংলা বহুদিন ধরে ছিল—
- মসলিনের দেশ
- জামদানির উৎপাদনকেন্দ্র
- তুলা ও রেশম শিল্পের অগ্রদূত
- ধাতুশিল্প, মৃৎশিল্প, কাঠশিল্পের সমৃদ্ধ ঘাঁটি
ইংরেজ শাসনে এই সব শিল্পই ধ্বংস হয়ে যায়।
৭. মসলিন ও বস্ত্রশিল্প ধ্বংস
বাংলার মসলিন ছিল বিশ্বের সেরা সূক্ষ্ম কাপড়, যার সুতো এত সূক্ষ্ম ছিল যে এক আঙুলের ফাঁকে লুকিয়ে ফেলা যেত। ইংরেজরা এই শিল্প ধ্বংস করতে নানা পদক্ষেপ নেয়।
৭.১ জোরপূর্বক সরবরাহ
মসলিন বয়নকারীদের কোম্পানি—
- বাধ্যতামূলক কম দামে পণ্য দিতে বলত
- প্রতিযোগিতা নিষিদ্ধ করত
- অগ্রিম টাকা দিয়ে কারিগরদের ঋণপাতে ফেলে রাখত
৭.২ শারীরিক নির্যাতন
ইতিহাসে উল্লেখ আছে, অনেকের—
- আঙুল ভেঙে দেওয়া হতো
- হাত কেটে দেওয়া হতো
- সুতা কাটার উপকরণ নষ্ট করা হতো
যদিও এ ধরনের সব বর্ণনা প্রমাণিত নয়, কিন্তু শোষণ ছিল নির্মম।
৭.৩ ইংল্যান্ডের শিল্প বিপ্লবের প্রভাব
কারখানায়—
- মেশিনে তৈরি কাপড়
- কম দামে
- দ্রুত উৎপাদনযোগ্য
ইংরেজরা তা প্রবল দামে বাংলায় ছড়িয়ে দেয়। ফলে মসলিন বয়ন পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়।
৮. কাঁচামাল রপ্তানি ও প্রস্তুত পণ্য আমদানির নীতি
ইংরেজরা বাংলায় কাঁচামাল উৎপাদনকে উৎসাহিত করে—
- পাট
- তুলা
- চা
- নীল
- ধাতব আকরিক
পাশাপাশি প্রস্তুত শিল্পপণ্য আমদানি করে স্থানীয় শিল্পকে ধ্বংস করে দেয়।
এটি ছিল উপনিবেশিক অর্থনীতির মুখ্য নীতি।
৯. কারুশিল্পের পতন
৯.১ লৌহ ও ধাতুশিল্প
ইউরোপীয় যন্ত্রদানার ফলে দেশীয় লৌহশিল্প প্রতিযোগিতায় টিকতে পারেনি।
৯.২ কাঠ ও মৃৎশিল্প
শহরে বিদেশি বিলাসপণ্যের আগমন স্থানীয় শিল্পকে নিস্তেজ করে দেয়।
৯.৩ কৃষিভিত্তিক কুটিরশিল্প
গ্রামীণ কুটিরশিল্প—বেত, বাঁশ, সুতা, দড়ি—এসবও বাজার হারাতে থাকে।
ঘ) বাংলার অর্থনৈতিক পতনের সামগ্রিক পরিণতি
১০. দারিদ্র্য ও ঋণের ফাঁদ
- কৃষক খাজনা দিতে না পেরে মহাজনের কাছে ঋণ নিতে বাধ্য হয়েছিল
- শিল্পীরা কাজ হারিয়ে শ্রমিক বনে যায়
- বণিকরা বাজার থেকে বিতাড়িত হয়
১১. নগর ও জনপদের পতন
ঢাকা, সোনারগাঁ, মুর্শিদাবাদ যে শহরগুলো একসময় সমৃদ্ধ ছিল, ইংরেজ শাসনে জনশূন্য হয়ে পড়ে।
১২. সামাজিক কাঠামোর ভাঙন
- কৃষকের দারিদ্র্য
- বণিক শ্রেণির বিলুপ্তি
- কারিগরদের পেশাহানি
- শহরের পতন
সমাজ হয়ে ওঠে দুর্বল, বিভক্ত, অনুন্নত।
ইংরেজ শাসনে বাংলার কৃষি, বাণিজ্য ও শিল্পের এমন ভয়াবহ পতন ঘটে যে একসময় বিশ্বের বাণিজ্যমানচিত্রে সবচেয়ে সমৃদ্ধ অঞ্চলগুলোর একটি বাংলা পরিণত হয় দারিদ্র্যপূর্ণ উপনিবেশে। কৃষি হয় খাজনা-নির্ভর, বাণিজ্য হয় কোম্পানিনির্ভর এবং শিল্প হয় কাঁচামাল-সরবরাহকারী অনুগত ব্যবস্থা। ইংরেজদের শোষণমূলক অর্থনৈতিক নীতি বাংলার অর্থনৈতিক শক্তি, সামাজিক স্থিতি ও সাংস্কৃতিক পরিসরকে চিরদিনের মতো বদলে দেয়।
এই পতনের প্রভাব পরবর্তী যুগে রাজনৈতিক সংগ্রাম, স্বাধীনতার দাবি এবং সামাজিক আন্দোলনের ভিত্তি তৈরি করে।
