আমাদের ছোট গাঁয়ে ছোট ছোট ঘর,
থাকি সেথা সবে মিলে নাহি কেহ পর৷
পাড়ার সকল ছেলে মোরা ভাই ভাই,
এক সাথে খেলি আর পাঠশালে যাই৷
আমাদের ছোট গ্রাম মায়ের সমান,
আলো দিয়ে, বায়ু দিয়ে বাঁচাইয়াছে প্রাণ৷
মাঠ ভরা ধান তার জল ভরা দিঘি,
চাঁদের কিরণ লেগে করে ঝিকিমিকি৷
আম গাছ, জাম গাছ, বাঁশ ঝাড় যেন,
মিলে মিশে আছে ওরা আত্মীয় হেন৷
সকালে সোনার রবি পুব দিকে ওঠে,
পাখি ডাকে, বায়ু বয়, নানা ফুল ফোটে৷
বন্দে আলী মিয়া
বন্দে আলী মিয়া (১৯০৬–১৯৭৯) ছিলেন বাংলা সাহিত্যের অন্যতম জনপ্রিয় কবি, সাহিত্যিক, নাট্যকার ও চিত্রশিল্পী। শিশুসাহিত্য, ছড়া, কবিতা, উপন্যাস, নাটক এবং চিত্রকর্ম—সব ক্ষেত্রেই তিনি রেখেছেন অনন্য স্বাক্ষর। সহজ-সরল ভাষা, গ্রামীণ জীবনের সৌন্দর্য ও মানবিক মূল্যবোধ তার লেখার প্রধান বৈশিষ্ট্য।
জন্ম ও শৈশব
বন্দে আলী মিয়া ১৭ জানুয়ারি ১৯০৬ সালে নাটোর জেলার কৃষ্ণনগর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম শেখ মোহাম্মদ মহসিন এবং মাতার নাম জোছনা খাতুন। ছোটবেলা থেকেই তিনি লেখালেখি, সঙ্গীত ও চিত্রকলায় আগ্রহী ছিলেন।
শিক্ষাজীবন
তিনি রাজশাহী জেলা স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন। পরবর্তী সময়ে রাজশাহী কলেজে পড়াশোনা করেন। শিক্ষাজীবনেই কবিতা ও শিল্পচর্চার মাধ্যমে তিনি সকলের নজর কাড়তে শুরু করেন।
সাহিত্যজীবন
বন্দে আলী মিয়া মূলত ছড়া, শিশুতোষ কবিতা, নাটক ও উপন্যাস লেখায় সর্বাধিক পরিচিত। তার ছড়াগুলোতে শিশুমনস্তত্ত্ব, প্রকৃতির রূপ ও লোকজ গ্রামবাংলার চিত্র দৃষ্টিনন্দনভাবে ফুটে ওঠে। তিনি ছিলেন একাধারে লেখক, নাট্যকার ও চিত্রশিল্পী। জনপ্রিয় পত্রিকা মাসিক মোহাম্মদী—তে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন।
প্রধান সাহিত্যকর্ম
তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থসমূহ—
- ছড়া-সংগ্রহ: মেঘ আসে, হেলে দুলে, মেঠোপথে, মা গো মা, পথের ছবি
- উপন্যাস: বনলতা, নকশি কাঁথার মাঠ, এক টুকরো বৃষ্টি
- নাটক: মেঘলা আকাশ, পথহারা
- শিশুসাহিত্য ও গল্প: বিভিন্ন গল্পগ্রন্থ এবং পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত বহু রচনা
- তিনি চিত্রশিল্পেও সমান দক্ষ ছিলেন এবং বহু বইয়ের প্রচ্ছদ ও অলংকরণ তৈরি করেছেন।
রচনার বৈশিষ্ট্য
- সহজ ও ছন্দোময় ভাষা
- গ্রামবাংলার প্রকৃতি ও লোকজ সংস্কৃতির জীবন্ত বর্ণনা
- নৈতিক শিক্ষা ও মানবিক মূল্যবোধ
- শিশুমনের আনন্দ, কৌতূহল ও কল্পনার রঙিন প্রকাশ
সম্মাননা
বাংলা সাহিত্যে অবদানের জন্য তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কারসহ বিভিন্ন জাতীয় সম্মাননায় ভূষিত হন। বাংলাদেশ রাষ্ট্র তাকে সাহিত্যক্ষেত্রে স্বতন্ত্র মহীমা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
মৃত্যু
বন্দে আলী মিয়া ১৯৭৯ সালের ২৭ মে পরলোকগমন করেন। মৃত্যুর পরও তার রচনাসম্ভার বাংলা সাহিত্যে এক অনন্য সম্পদ হিসেবে স্থান করে নিয়েছে।
