আজিকার শিশু– বেগম সুফিয়া কামাল

শ্রেণি: ৩য়, বিষয়: বাংলা, ধরন: কবিতা

আমাদের যুগে আমরা যখন খেলেছি পুতুল খেলা
তোমরা এ যগে সেই বয়সেই লেখাপড়া কর মেলা।
আমরা যখন আকাশের তলে ওড়ায়েছি শুধু ঘুড়ি
তোমরা এখন কলের জাহাজ চালাও গগন জুড়ি।
উত্তর মেরু, দক্ষিণ মেরু সব তোমাদের জানা
আমরা শুনেছি সেখানে রয়েছে জিন ,পরী, দেও, দানা।
পাতালপুরীর অজানা কাহিনী তোমরা শোনাও সবে
মেরুতে মেরুতে জানা পরিচয় কেমন করিয়া হবে।
তোমাদের ঘরে আলোর অভাব কভূ নাহি হবে আর
আকাশ-আলোক বাঁধি আনি দূর করিবে অন্ধকার।
শস্য-শ্যামলা এই মাটি মা’র অঙ্গ পুষ্ট করে
আনিবে অটুট স্বাস্থ্য, সবল দেহ-মন ঘরে ঘরে।
তোমাদের গানে, কল-কলতানে উছসি উঠিবে নদী-
সরস করিয়া তৃণ ও তরুরে বহিবে সে নিরবধি
তোমরা আনিবে ফুল ও ফসল পাখি-ডাকা রাঙা ভোর
জগৎ করিবে মধুময়, প্রাণে প্রাণে বাঁধি প্রীতিডোর।

সুফিয়া কামাল – জীবন ও সাহিত্যচর্চা

প্রাথমিক জীবন

সুফিয়া কামাল জন্মগ্রহণ করেন বরিশালের শায়েস্তাবাদে। ১৯১৮ সালে সাত বছর বয়সে তার বাবা নিরুদ্দেশ যাত্রা করেন। ফলে মা সাবেরা খাতুনের সঙ্গে বাবার বাড়িতে আশ্রয় নেন। তার শৈশব নানাবাড়িতে কেটেছে। জন্ম পরিবারে নারী শিক্ষাকে তেমন গুরুত্ব দেওয়া হত না। মাতৃকুলের নবাব পরিবারের কথ্য ভাষা ছিল উর্দু। অন্দরমহলে মেয়েদের আরবি ও ফারসি শেখানো হলেও বাংলা শেখার ব্যবস্থা ছিল না। তাই সুফিয়া বাংলা মূলত তার মায়ের কাছ থেকে শিখেছেন।

নানাবাড়ির বড় মামার গ্রন্থাগারে পড়াশোনার সুযোগ ও মায়ের উৎসাহ সাহিত্যচর্চায় সহায়ক হয়। ১৯২২ সালে ১১ বছর বয়সে তার মামাতো ভাই সৈয়দ নেহাল হোসেনের সঙ্গে বিয়ে হয়। নেহাল আধুনিকমনা ছিলেন এবং সুফিয়াকে সাহিত্য ও সমাজসেবায় উৎসাহিত করেন।

১৯১৮ সালে কলকাতায় যাওয়ার সময় তার পরিচয় হয় বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে। বেগম রোকেয়ার কাজ ও চিন্তাধারা সুফিয়া কামালের জীবনে গভীর প্রভাব ফেলে।


সাহিত্যচর্চার সূচনা ও কলকাতার জীবন

সাহিত্যপাঠের পাশাপাশি সুফিয়া কামাল সাহিত্য রচনা শুরু করেন। ১৯২৬ সালে তার প্রথম কবিতা ‘বাসন্তী’ প্রকাশিত হয় সাময়িকী সওগাতে। ১৯৩০-এর দশকে কলকাতায় অবস্থানকালে তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় প্রমুখের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।

তিনি বেগম রোকেয়ার প্রতিষ্ঠিত ‘আঞ্জুমানে খাওয়াতিনে ইসলামে’ সংগঠনে অংশ নেন। সাহিত্যচর্চার প্রসঙ্গে তিনি লিখেছেন, ছোটবেলায় কবিতা ও গল্প লেখা শুরু করেছিলেন, যদিও লজ্জা ও ভয়ে অনেক লেখা লুকিয়ে রাখতে হতো।

১৯৩৭ সালে তার গল্প সংকলন ‘কেয়ার কাঁটা’ প্রকাশিত হয়। ১৯৩৮ সালে তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘সাঁঝের মায়া’ প্রকাশিত হয়, যা কাজী নজরুল ইসলাম সমর্থন করেন এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রশংসা করেন।

১৯৩২ সালে স্বামীর আকস্মিক মৃত্যু তাঁকে আর্থিক সমস্যায় ফেলেছিল। তিনি কলকাতা কর্পোরেশন স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন। ১৯৩৯ সালে কামালউদ্দিন আহমেদের সঙ্গে দ্বিতীয় বিয়ে করেন। দেশবিভাগের পূর্বে কিছু সময় নারীদের জন্য প্রকাশিত সাময়িকী বেগম-এর সম্পাদক ছিলেন।


ঢাকার জীবন ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড

১৯৪৭ সালে দেশবিভাগের পর তিনি ঢাকা আসেন। ভাষা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন এবং নারীদের উদ্বুদ্ধ করেন। ১৯৫৬ সালে শিশুদের সংগঠন কচিকাঁচার মেলা প্রতিষ্ঠা করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম মহিলা হোস্টেলকে ‘রোকেয়া হল’ নামকরণের দাবি জানান।

১৯৬১ সালে পাকিস্তান সরকার কর্তৃক রবীন্দ্রসঙ্গীত নিষিদ্ধের প্রতিবাদে আন্দোলনে অংশ নেন। ১৯৬৯ সালে মহিলা সংগ্রাম কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হন এবং পাকিস্তান সরকার প্রদত্ত তমঘা-ই-ইমতিয়াজ পদক প্রত্যাখ্যান করেন। ১৯৭০ সালে মহিলা পরিষদ প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৭১ সালের মার্চে অসহযোগ আন্দোলনে নারীদের মিছিলে নেতৃত্ব দেন।

স্বাধীন বাংলাদেশে নারীজাগরণ ও সমাধিকার প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। ১৯৯০ সালে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে অংশ নেন।


সাহিত্যকর্ম

কাব্যগ্রন্থ:

  • সাঁঝের মায়া (১৯৩৮)
  • মায়া কাজল (১৯৫১)
  • মন ও জীবন (১৯৫৭)
  • প্রশস্তি ও প্রার্থনা (১৯৫৮)
  • উদাত্ত পৃথিবী (১৯৬৪)
  • দিওয়ান (১৯৬৬)
  • অভিযাত্রিক (১৯৬৯)
  • মৃত্তিকার ঘ্রাণ (১৯৭০)
  • মোর জাদুদের সমাধি পরে (১৯৭২)
  • Mother of Pearls and Other Poems (ইংরেজি)

গল্প:

  • কেয়ার কাঁটা (১৯৩৭)
  • মুক্তিযুদ্ধ মুক্তির জয়

ভ্রমণকাহিনি:

  • সোভিয়েতে দিনগুলি (১৯৬৮)

স্মৃতিকথা ও আত্মজীবনী:

  • একাত্তরের ডায়েরি (১৯৮৯)
  • একালে আমাদের কাল (১৯৮৮)

শিশুতোষ:

  • ইতল বিতল (১৯৬৫)
  • নওল কিশোরের দরবারে (১৯৮১)

অনুবাদ:

  • সাঁঝের মায়া – বলশেভনী সুমের্কী (রুশ, ১৯৮৪)

পুরস্কার ও সম্মাননা

  • পাকিস্তান সরকারের তমঘা-ই-ইমতিয়াজ (১৯৬১, প্রত্যাখ্যান ১৯৬৯)
  • বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৬২)
  • সোভিয়েত লেনিন পদক (১৯৭০)
  • একুশে পদক (১৯৭৬)
  • নাসিরউদ্দিন স্বর্ণপদক (১৯৭৭)
  • সংগ্রামী নারী পুরস্কার, চেকোশ্লোভাকিয়া (১৯৮১)
  • মুক্তধারা পুরস্কার (১৯৮২)
  • বেগম রোকেয়া পদক (১৯৯৬)
  • জাতীয় কবিতা পরিষদ পুরস্কার (১৯৯৫)
  • দেশবন্ধু সি আর দাস গোল্ড মেডেল (১৯৯৬)
  • স্বাধীনতা পুরস্কার (১৯৯৭)

মৃত্যু

সুফিয়া কামাল ১৯৯৯ সালের ২০ নভেম্বর মৃত্যুবরণ করেন। তিনি পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত হন। বাংলাদেশি নারীদের মধ্যে তিনিই প্রথম এই সম্মান লাভ করেন। প্রতি বছর তার মৃত্যুবার্ষিকী আনুষ্ঠানিকভাবে স্মরণ করা হয়।

২০১৯ সালে তার ১০৮তম জন্মদিনে গুগল ডুডল দ্বারা সম্মান জানানো হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *